আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সময়ের পরিক্রমায় সারা বিশ্বেই আজ বদলেছে নারীর অবস্থান। ঘরকুনো জীবন থেকে বেরিয়ে নারীরা আজ সব বাধা পেরিয়ে যুক্ত হচ্ছেন চ্যালেঞ্জিং সব পেশায়। একসময় যেসব ক্ষেত্রে পুরুষদের আধিপত্য ছিল, সেখানেও এখন নারীরা সমানতালে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। নিজের স্বপ্নের কথা শোনা এবং স্বপ্নপূরণের পথে চলা নারীদের মধ্যে একজন সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব স্থপতি সাদিয়া তারাননুম। স্থাপত্যকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে তিনি পরিচালনা করছেন তার নিজস্ব আর্কিটেকচারাল স্টুডিও ‘আরকারখানা’। পেশাগত ব্যস্ততার পাশাপাশি তিনি একজন নিপুণ চিত্রশিল্পীও বটে। নারী দিবস উপলক্ষে নিজের পথচলা, কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মির্জা হাসান মাহমুদ
কেমন আছেন?
ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ।
চিত্রশিল্পী হিসেবে আপনার ব্যস্ততা তো আমরা জানি, কিন্তু স্থপতি হিসেবে ইদানীং কীভাবে সময় কাটছে?
চিত্রশিল্পী তো আমি শখের বশে তবে স্থাপত্যই আসলে আমার পেশা ও নেশা। স্থপতি হিসেবে একটু ব্যস্ততার মাঝেই সময় কাটছে। আরকারখানা নামে আমার একটি আর্কিটেকচারাল স্টুডিও আছে। বর্তমানে একটা রেস্টুরেন্ট, দুইটা ইন্টেরিয়র প্রজেক্ট আর গাজীপুরে একটা দোতলা রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিংয়ের কাজ করছি। সবমিলিয়ে বেশ কয়েকটা কাজের প্রেশার এক সঙ্গে যাচ্ছে। সঙ্গে সংসার, সন্তান আর আঁকা-আঁকি তো আছেই।
স্থাপত্যের মতো পেশাকে কেন নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিলেন?
স্থাপত্য আসলে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণই এর প্রতি ভালোবাসা। প্যাশান আর ভালোলাগা না থাকলে এই পেশায় ক্যারিয়ার অসম্ভব। ছোটবেলা থেকেই যখন বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই আঁকা-আঁকি ভালো লাগত। বিভিন্ন জিনিসপাতি বানাতাম। একটু অন্যরকম বিল্ডিং বা যেকোনো ইন্টারেস্টিং স্ট্রাকচার দেখলেই দেখতে থাকতাম, বোঝার চেষ্টা করতাম। আবার একটু নার্ড টাইপের থাকাতে পড়াশোনা করতেও ভালো লাগত। ফিজিক্স, মেকানিক্স, ম্যাথ এসব সাবজেক্টে বেশ ভালো ছিলাম।
স্থপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখার পেছনে বিশেষ কোনো ঘটনা কি রয়েছে?
আপু ভাইয়াদের মডেল দেখে বেশ ইন্সপায়ার্ড থাকতাম ছোটবেলায়। ক্লাস সিক্স থেকেই কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলতাম বড় হয়ে আর্কিটেক্ট হব। তখন থেকেই যে ভূত চেপেছিল বড় হয়ে পাঁচ বছর স্থাপত্যের আন্ডার গ্র্যাড লাইফের জাতাকলে পড়ে, দিনরাত নির্ঘুম পার করেও মনে হয়েছে ঠিক জায়গায়ই আছি। স্থাপত্যই আমার জায়গা। এখন তো প্রায় পাঁচ বছর হয়ে যাচ্ছে স্থপতি হিসেবে। এখনো ভালো লাগার জায়গাটা একই আছে।
আর্কিটেকচারের মতো ফিল্ডে কাজের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কী?
প্রফেশনাল লাইফে ঢুকে বুঝতে পারি ফিল্ডে মেয়ে স্থপতিদের কত অভাব। যেকোনো আর্কিটেকচারাল স্কুলে গেলে দেখতে পাবেন ছেলেদের থেকে মেয়েদের সংখ্যা কত বেশি। অথচ প্রফেশনাল লাইফে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এইটার একটা বড় কারণ। আমরা তো শুধু ডেস্কে বসে ডিজাইনই করি না, সাইটে গিয়ে অনেক সময়ই পুরো জিনিসটা এক্সিকিউট করতে হয়। ফিল্ডে মিস্ত্রি থেকে শুরু করে সাইটের দারোয়ান সবার কাছেই মেয়ে স্থপতি হিসেবে আলাদা করে জায়গা করে নিতে হয় তখন। কথার গুরুত্ব এরা সহজে দিতে চায় না। এগুলো আসলে কম-বেশি ফেস করতেই হয় কিন্তু এর মধ্যেই আমাদের আসলে জায়গা করে নিয়ে কাজ করতে হয়। এর কোনো বিকল্প নেই। প্রতিনিয়তই প্রমাণ করতে হয় যে নারী হয়েও আমি এই কাজটি করতে সক্ষম। আর আসলে প্যাশানের জন্যই করা। একটা ভালো প্রজেক্ট করার পর যেই আনন্দ হয় তখন এই কষ্টগুলো সার্থক হয়ে যায়।
আমরা জানি আপনি একজন দারুণ চিত্রশিল্পী। আবার একজন ভালো আর্কিটেক্টও। দুটোর সমন্বয় করেন কীভাবে?
চিত্রশিল্পী হওয়াটা আর্কিটেক্ট হওয়ার ক্ষেত্রে একটা বড় শক্তি। স্থাপত্যও এক ধরনের আর্ট। ল্যান্ডস্কেপিং অনেক সময় আমি পেইন্টিং করেই করি। অনেক সময় অনেক চিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্থাপনার আইডিয়া পাই। অনেক সময় স্থাপনাটা চিত্রশীল্পের মাধ্যমে দেখাই। দুইটা আসলে একে অপরের পরিপূরক বলতে পারেন।
ঘর এবং বাইরের পেশাগত দায়িত্ব, দুটোর মধ্যে ভারসাম্য রাখা চ্যালেঞ্জিং মনে হয় না?
ঘর এবং বাইরের পেশাগত দায়িত্ব দুইটা একসঙ্গে খুবই চ্যালেঞ্জিং মনে হয়। যারা স্থাপনা ক্যারিয়ারে আছে তারা জানে স্থাপত্য আসলে কি পরিমাণ সময়, এনার্জি এবং ডেডিকেশন সাপেক্ষ একটা পেশা। একটা চার বছরের সন্তান নিয়ে নিজে একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর চেষ্টাটা মাঝেমধ্যে খুবই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। আমার ফ্যামিলি এই ব্যাপারে খুব সাপোর্টিভ। ওদের সাপোর্ট না থাকলে সংসার আর স্থাপত্য এক সঙ্গে করা কখনোই সম্ভব হতো না।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মেয়েদের জন্য স্থপতি হওয়ার পথটা কি এখন আগের চেয়ে সহজ হয়েছে? আসলেই কেমন হওয়া উচিত?
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মেয়েদের জন্য স্থপতি হওয়ার পথটা আগের চেয়ে কিছুটা সহজ হয়েছে বলা যায়। তবে যে দেশে বেশির ভাগ মানুষ স্থপতিদের কাজ কি সেটাই জানেন না বা স্থপতিকে আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেকচার বিভিন্ন নামে ডাকেন, তাদের কাছে মেয়ে স্থপতিদের গ্রহণযোগ্যতা হতে একটু সময় লাগবে। তবে আজকাল অনেকেই বোঝেন। নারী স্থপতিদেরও প্রাপ্য সম্মান দিতে শিখেছেন।
ভবিষ্যতে যে নারীরা আর্কিটেক্ট হতে চায়, তাদের উদ্দেশ্যে কি পরামর্শ থাকবে?
আর্কিটেক্ট মেরিনা তাবাসসুম, আর্কিটেক্ট সাইকা ইকবাল মেঘনা, আর্কিটেক্ট সারাওয়াত ইকবাল তিশাদের মতো অনেক ইন্সপায়ারিং নারী স্থপতি দেশে অনেক ভালো ভালো কাজ করছেন। দেশ-বিদেশ থেকে এওয়ার্ড নিয়ে আসছেন। সুতরাং আমি মনে করি স্থাপত্যের নারীদের জন্য এখন বেশ ভালো সময়।
যে নারীরা ভবিষ্যৎ আর্কিটেক্ট হতে চাও, ওদের আমি বলব লেগে থাকো, হাল ছেড়ো না। আমাদের পেশাটা একটু কঠিন, একটু ডেডিকেশনের জায়গাটা লাগে। কিন্তু ভালো কাজের পর সব সার্থক মনে হয়। স্থাপত্য পেশায় কষ্ট যেমন আছে, ভালো লাগাটাও তেমনই আসলে। চোখ-কান খোলা রেখে স্থাপত্য নিয়ে, শিল্প নিয়ে, সবকিছু নিয়ে বেশি বেশি দেখতে থাকো, জানতে থাকো। তোমাদের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন