বিদেশে অবস্থানরত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ দিলীপ ওরফে বিনাশের নির্দেশে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বিরকে খুন করা হয়েছে বলে জানান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিনাশের নির্দেশে মোটা টাকার বিনিময়ে সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত নকশায় স্বেচ্ছাসেবক দলের এই নেতাকে হত্যা করতে শুটার ভাড়া করা হয়। সম্প্রতি এই ঘটনায় তদন্ত করে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, মোটা অর্থের বিনিময়ে ভাড়াটে শুটার জিন্নাত-আবদুর রহিম মুসাব্বিরকে গুলি করে পালিয়ে যায়।
ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে বিশ্লেষণ করে আলোচিত এই হত্যার ঘটনায় চিহ্নিত দুই শুটারকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পুলিশ বলছে, আসামিরা কয়েকবার মুছাব্বিরকে হত্যা করতে গিয়ে ফিরে আসে। পরে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ দিলীপের নির্দেশে ফের কিলিং মিশনে চৌকস শুটার জিন্নাত-আবদুর রহিমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সকালে মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম জানান, মোটা অর্থের বিনিময়ে ভাড়াটে দুই বন্দুকধারী জিন্নাত ও আবদুর রহিম মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করে।
ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে দু’জনকেই দেখা গেছে। এর আগে অপরাধীদের ধরতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত শুক্রবার ভোরে অভিযান চালিয়ে নরসিংদী জেলার মাধবদী এলাকা থেকে শুটার আবদুর রহিমকে (৪৫) গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দু’টি বিদেশি পিস্তল, দু’টি ম্যাগাজিন ও ১২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মাধবদী থানায় রহিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের একজন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলেও জানান ডিবি।
শীর্ষ সন্ত্রাসী বিনাশের সঙ্গে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের যোগাযোগ রয়েছে: ডিবি
মুছাব্বির হত্যাকাণ্ড নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়ে ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি- প্রধান) শফিকুল ইসলাম জানান, এই খুনের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী দিলীপ ওরফে বিনাশের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ জোগাড় করে খুনের অভিযোগে এ পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচজনকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয় প্রশাসন।
কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণের কাল হয়ে দাড়িয়েছে মুছাব্বিরের: মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডের পরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ রহস্য উদঘাটনে ডিবির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এই হত্যার ঘটনায়, এরপর ১০ জানুয়ারি ঢাকা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে দুই ‘শুটারের’ একজন জিন্নাত, ‘মূল সমন্বয়কারী’ মো. বিল্লাল, ঘটনার পর আসামিদের আত্মগোপনে সহায়তাকারী আব্দুল কাদির এবং ঘটনার আগেরদিন ঘটনাস্থল ‘রেকি’ করা মো. রিয়াজকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় ডিবি। সেসময় তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের সময় ব্যবহৃত নম্বর প্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল এবং নগদ ৬ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। গত ১২ জানুয়ারি জিন্নাত আদালতে ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দি দেন। ওইদিন দুই ভাই বিল্লাল ও আব্দুল কাদিরের সঙ্গে রিয়াজকে সাত দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত। সেই রিমান্ড শেষে ১৯ জানুয়ারি আসামিদের আদালতে হাজির করেন তদন্ত কর্মকর্তা। বিল্লালকে আবারও রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন তিনি। পরে তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক। আসামি মো. বিল্লালকে দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার কারাগারে পাঠায় আদালত। আর এদিন রাতেই নরসিংদীতে অভিযানে গিয়ে আরেক শুটার রহিমকে গ্রেপ্তার করল ডিবি।
খুনের পর আসামিরা আত্মগোপনে চলে যায়: এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে হত্যা করা হয়।
ডিএমপির ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, মূল পরিকল্পনাকারী মো. বিল্লাল, শুটার জিন্নাত ও মো. রিয়াজ এবং অনান্য আসামিরা আত্মগোপনে চলে যায়। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় জড়িত ও সহায়তাকারী বিল্লালের ভাই আব্দুল কাদিরকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক ভাবে জানা যায় অপরাধীরা কারওয়ান বাজারে ব্যবসার দ্বন্দ্বে নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড সঙ্গে যুক্ত হয়। গ্রেপ্তারকৃত সকল আসামিরা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন দাবি, ডিবি প্রধাণের।
পুলিশ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, মুসাব্বিরকে হত্যার দায়িত্ব বিদেশ থেকে বিল্লালকে দেন তার এক বড় ভাই। ১৫ লাখ টাকা ও মামলা সংক্রান্ত্র সব দায়িত্ব নেয়ার আশ্বাসে রাজি হন বিল্লাল। পরে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা ও একটি মোটরসাইকেলের চুক্তিতে শুটার জিন্নাতকে ভাড়া করেন তিনি। ডিবিপ্রধান আরও জানান, জিন্নাতের আগে গ্রেপ্তার রিয়াজকে ভাড়া করেন বিল্লাল। কিন্তু রিয়াজ হত্যার আগের দিন মুসাব্বিকে হত্যা না করে চলে আসেন। পরে দায়িত্ব পান জিন্নাত।
নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক সেচ্ছাসেবক দলের এক সাবেক নেতা জানান, মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ আমাদের দলের অনেককে হয়রানী করেছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কিন্তু দুখের বিষয় হলো গতকাল আরেক শুটার ধরা পড়লেও অস্ত্র উদ্ধার নিয়ে রহস্য তৈনি হয়েছে।

