কোডার থেকে কারখানার শ্রমিক- কোনো পেশাই আর নিরাপদ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতিতে ২০৩০ সালের মধ্যেই বিশ্বের ৯৯ শতাংশ মানুষ চাকরি হারাতে পারেন- এমন বিস্ফোরক সতর্কবার্তা দিয়েছেন রোমান ইয়াম্পোলস্কি। লুইসভিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক মনে করেন, আমরা এমন এক যুগের দিকে এগোচ্ছি যেখানে পুনঃপ্রশিক্ষণও আর কার্যকর সমাধান হবে না।
সম্প্রতি দ্যা ডাইরি সিইওর দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা ১০ শতাংশ বেকারত্বের কথা বলছি না, বলছি ৯৯ শতাংশ।’
তার মতে, মানুষের মতো চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা খুব দ্রুত বাস্তবে পরিণত হতে পারে। একবার তা ঘটলে, কম খরচে এবং অধিক দক্ষতায় কাজ করা যন্ত্র ও মানবাকৃতির রোবটের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মানুষ টিকতে পারবে না।
বর্তমানে ওপেনএআই, গুগল ও অ্যানথ্রোপিক–এর মতো শীর্ষ প্রযুক্তি সংস্থাগুলো কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা অর্জনের লক্ষ্যে বিপুল বিনিয়োগ করছে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছে, নিরাপত্তা প্রক্রিয়া ও গবেষণার চেয়ে বাজারযোগ্য পণ্য তৈরিতেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই স্বীকার করেছেন যে তাদের তৈরি উন্নত মডেলগুলো ঠিক কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এই অনিশ্চয়তা প্রযুক্তিটির ভবিষ্যৎ ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতি না হুমকি?
রোমান ইয়াম্পোলস্কি আরও দাবি করেছেন, অনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
তার মতে, প্রযুক্তিটি যদি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তা থামানো অত্যন্ত কঠিন হবে।
যদিও তিনি এটাও বলেন, এখনো সময় আছে- যদি নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি নির্মাতারা দায়িত্বশীলভাবে এগোন এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ান।
চাকরি হারানোই হতে পারে মুক্তি?
একই সময়ে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে বেন গোয়ের্টজেল–এর কাছ থেকে। সিঙ্গুলারিটি নেটের এই প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যেই অধিকাংশ চাকরি বিলীন হয়ে যেতে পারে। তবে তিনি এটিকে মানবজাতির জন্য মুক্তির সম্ভাবনা হিসেবেই দেখেন।
তার যুক্তি, মানুষ বাধ্য হয়ে কাজ করে; যন্ত্র যদি জীবিকার দায় কাঁধে নেয়, তবে মানুষ সৃজনশীলতা, গবেষণা ও সমাজসেবার মতো কাজে মনোযোগ দিতে পারবে।
বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্র হয়তো সাময়িকভাবে টিকে থাকবে। যেমন- জটিল শারীরিক কাজ, যেখানে মানুষের দক্ষতা এখনো অপরিহার্য; মানবিক সংযোগভিত্তিক পেশা, যেখানে আবেগ ও সহানুভূতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ; মৌলিক সৃজনশীল কাজ; কৌশলগত নেতৃত্ব; এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি।
তবে ইয়াম্পোলস্কির বক্তব্য আরও কঠোর। তার মতে, যদি সব কাজই স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায়, তবে বিকল্প পরিকল্পনা বলে কিছু থাকবে না। পুনঃপ্রশিক্ষণের ধারণাও তখন অর্থহীন হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ কাজ হারালে মানুষের শুধু আয় নয়, পরিচয়, সামাজিক অবস্থান ও জীবনের উদ্দেশ্যও বদলে যেতে পারে।
২০৩০ সাল খুব দূরে নয়। আমরা কি এমন এক পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত, যেখানে সকালবেলা অ্যালার্ম বাজবে না- কারণ অফিসই থাকবে না? নাকি এটি প্রযুক্তি-উদ্বেগের অতিরঞ্জিত আশঙ্কা?

