পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক ডিরেক্টর (এনফোর্সমেন্ট) মুনীর চৌধুরী এক ফেসবুক পোস্টে সামরিক কর্মকর্তা, সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী বিভিন্ন মহল নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি দায়িত্বে থাকাকালে প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলের চাপ, হুমকি এবং প্রশাসনিক অসহযোগিতার চিত্র তুলে ধরে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান চালাতে গিয়ে তাকে মন্ত্রী, সামরিক কর্মকর্তা এবং কর্পোরেট শক্তির সম্মিলিত চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল।
বিশেষ করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বন ও পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। শেখ মামুন খালেদ বর্তমানে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার অবস্থায় রিমান্ডে আছেন।
রূপালী বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য তার ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
ফেসবুকে আমি সরব নই। আজ একটি সত্য প্রকাশ না করে পারলাম না। এ যেন বিবেকের দংশন! জেনারেল মামুন খালেদ ছিলেন এক সময়কার দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সামরিক কর্মকর্তা। আমি ছিলাম পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিরেক্টর (এনফোর্সমেন্ট)। বহু রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী এবং প্রভাবশালীদের দখল থেকে উদ্ধার করছিলাম নদী, খাল, জলাশয়, পাহাড় ও বনভূমি। একদিকে মন্ত্রী ও প্রভাবশালীদের চাপ, অন্যদিকে কর্পোরেট শক্তিগুলোর হুমকি।
ঢাকা বিমানবন্দরের অদূরে প্রায় ২৫০ একর প্রাকৃতিক জলাশয় ও নিরীহ মানুষের জমি, এমনকি কবরস্থান দখল করে গড়ে উঠছিল আসিয়ান সিটির বিশাল আবাসন প্রকল্প পুরোটাই অবৈধ। প্রশাসন, রাজউক, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ সবার নীরবতা দেখে অসহায় মানুষের কান্না ও অভিশাপে আকাশ ভারী হয়ে উঠছিল। অজস্র অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল রাজউক, পুলিশ, প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে, কিন্তু কোনো প্রতিকার ছিল না। রাজউক চেয়ারম্যান আমাকে বললেন, “মুনীর চৌধুরী আমি অসহায়।” অতঃপর সাহস করে অভিযানে নামলাম। অবৈধ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ও স্থাপনা জব্দ করে অকেজো করে দিলাম। প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলীকে গ্রেপ্তার করলাম। ততক্ষণে পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের চাপ, এবং অবশেষে ডিজিএফআই প্রধান মামুন খালেদের হুমকি, চাপ ও রক্তচক্ষু।
ঘটনাস্থলে তার কর্নেল স্টাফকে পাঠানো হলো। অভিযান বন্ধের নির্দেশ এলো। আমি কর্নেল স্টাফকে ফিরিয়ে দিলাম। অভিযান অব্যাহত রেখে পুরো প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে আমার নিয়ন্ত্রণে আনলাম। ক্ষতিগ্রস্ত শত শত বাসিন্দাকে বললাম, “কোনো ভয় নেই, আমি পাশে আছি। অবৈধ আবাসন হবে না।” চাপ আরও ভয়ংকরভাবে বাড়তে লাগল। মন্ত্রী বললেন, “জেনারেল মামুন টাকার বস্তাসহ আপনাকে গ্রেপ্তার করে মিডিয়ায় রিপোর্ট করবেন। আপনি অভিযান বন্ধ করুন। সেনাবাহিনী ক্ষেপে গেলে আওয়ামী সরকারের টিকে থাকা দায় হবে।” ক্ষোভ ঝেড়ে প্রত্যুত্তরে বললাম, “স্যার, আপনি সরকারের মন্ত্রী নন? কেন ভয়?” সেই কর্নেল স্টাফের বারবার অনুরোধ ছিল, আসিয়ানের মালিকের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আমার জবাব ছিল, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দেশের স্বার্থ সবার ঊর্ধ্বে। এরপর আসিয়ানের মালিককে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে, তাকে চাপ দিয়ে সেই জরিমানা আদায় করলাম। এতে পরিবেশমন্ত্রী এবং জেনারেল মামুন আরও ক্ষিপ্ত হলেন। আমার মন বলছিল, কিসের জেনারেল মামুন খালেদ? কিসের ডিজিএফআই-এর হুমকি? সর্বময় ক্ষমতা আল্লাহর। সেই রাতে আরও ভয়ংকর ঘটনা ঘটে। আমি পরিবেশ ভবনে রাতযাপন করতাম, সেখান থেকে রাত-দিন সারা বাংলাদেশে অভিযান পরিচালনা করতাম। আমার কোনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ছিল না। যদিও “বেলা” কিংবা পরিবেশবাদী কোনো সংগঠন সেই পরিস্থিতিতে আমার পাশে দাঁড়ায়নি।
কোথায় আজ জেনারেল মামুন খালেদ? সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা সীমা অতিক্রম করলে তা যে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয়, এটি তার অনন্য নজির। সরকারকে অনুরোধ জানাব, সামরিক বাহিনীর আবাসন প্রকল্প জলসিঁড়ি বাস্তবায়নে জেনারেল মামুন খালেদের দুর্নীতির ঘটনা উদ্ঘাটন করুন। রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বস্তরে পেশাদারিত্ব, সততা ও যোগ্যতাকে সম্মান ও মূল্যায়ন করুন। নতুবা শাসনের সংকট থেকেই যাবে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তরুণ প্রজন্মের কর্মকর্তাদের আহ্বান জানাই এসিআর অবমূল্যায়নের ভীতি, পদোন্নতি বঞ্চনার আতঙ্ক কিংবা শাস্তিমূলক বদলির আশঙ্কায় কোনো রক্তচক্ষুকে ভয় পাবেন না। পার্থিব এই পদ-পদবি ও অর্থবিত্ত একসময় ভঙ্গুর ও শূন্য হয়ে যায়।

