রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরকে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের সহিংস ঘটনাকে ঘিরে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নতুন করে আসামি করা হচ্ছে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই সময় র্যাবের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় শাপলা চত্বরে অভিযান পরিচালনার সময় সংঘটিত কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে।
বুধবার ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে সংঘটিত ঘটনাটি নিয়ে তদন্তে সাবেক এই পুলিশ প্রধানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট অগ্রগতি জানা যেতে পারে।
এর আগে অন্য একটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে রাজসাক্ষী হন আবদুল্লাহ আল মামুন। ওই মামলায় তিনি পাঁচ বছরের লঘুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছেন।
শাপলা চত্বরের মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, তৎকালীন সময়ে দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয় তদন্তে উঠে আসছে। তদন্তে যার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ মিলবে, তিনি যে সংস্থারই হোন না কেন সবার বিরুদ্ধেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, শাপলা চত্বরের ঘটনাকে একটি পৃথক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে আলাদাভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশে সংঘটিত গুম ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এসব ঘটনার মধ্যে যেগুলো ব্যাপক ও পরিকল্পিত অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হবে, সেগুলো ধাপে ধাপে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারাধীন আনা হবে।
রাজসাক্ষী হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার বিনিময়ে পাওয়া দায়মুক্তি অন্য কোনো পৃথক ঘটনায় প্রযোজ্য নয়। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায় (সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি) আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়।
বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। গত ৫ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ থাকলেও প্রসিকিউশনের আবেদনে ট্রাইব্যুনাল-১, বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে, পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেছে আগামী ৭ জুন।
এ মামলায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল এবং একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি শাহরিয়ার কবির।
উল্লেখ্য, ‘নারী উন্নয়ন নীতি’ ও ‘শিক্ষা নীতি’-এর বিরোধিতার প্রেক্ষাপটে ২০১০ সালে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম গড়ে ওঠে। পরে ২০১৩ সালে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে সংগঠনটি রাজপথে নামে এবং ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
২০১৩ সালের ৫ মে ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডাকে হেফাজতে ইসলাম। ওই সমাবেশকে ঘিরে এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। রাতের অভিযানে যৌথ বাহিনী তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়।
সে সময় মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ দাবি করেছিল, অভিযানে ৬১ জন নিহত হয়েছেন। তবে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের অভিযানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি; দিনের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ছিল ১১।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, একই মাসের ২০ আগস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়। এতে শেখ হাসিনা ছাড়াও সাবেক প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ, লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ মোট ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
-20260415200359.webp)

