সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মোংলা বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি। একই সঙ্গে বনদস্যু দমন, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
শুক্রবার (১২ জুন) সকালে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য জানান।
কোস্ট গার্ড জানায়, বর্তমান সরকারের নির্দেশনায় সুন্দরবনে সক্রিয় বনদস্যুদের নির্মূল এবং জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালি ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এসব অভিযানে ৩৯ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪২টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড তাজা গোলা, ২৫০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৯৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগান গোলা, একটি ককটেল, একটি টেলিস্কোপ ও দুটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বনদস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা ৪১ জনকে জীবিত উদ্ধার করে চিকিৎসা সহায়তা শেষে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
কোস্ট গার্ডের দাবি, ধারাবাহিক অভিযানের ফলে সুন্দরবনের সক্রিয় দস্যু বাহিনীগুলো ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কঠোর নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতার কারণে দস্যুরা কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় কুখ্যাত ছোট সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন হাওলাদার ও তার সহযোগীরা গত ১৭ মে কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। একই সঙ্গে অবশিষ্ট সক্রিয় বনদস্যুদের অস্ত্র ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মৎস্য সম্পদের প্রজনন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সরকার ঘোষিত তিন মাসের পর্যটক প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন, অবৈধ মাছ আহরণ, বন্যপ্রাণী শিকার ও বনজ সম্পদ পাচার প্রতিরোধেও কোস্ট গার্ড সক্রিয় রয়েছে। প্রয়োজনে নৌবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বন বিভাগসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিয়মিত টহল, বন্দর চ্যানেল ও নৌপথে সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রটোকল রুটে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এতে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য নির্বিঘ্ন রাখতে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানায় কোস্ট গার্ড।
এছাড়া দেশের সমুদ্রসীমা, উপকূলীয় অঞ্চল ও নদীতীরবর্তী সীমান্ত এলাকায় অবৈধ পুশ-ইন প্রতিরোধে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আধুনিক ড্রোন ও সার্ভেইল্যান্স প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
কোস্ট গার্ড জানায়, সুন্দরবনের মোংলা থানাধীন জয়মনির ঘোল এলাকা দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যুদের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সেখানে একটি কোস্ট গার্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে দস্যুদের রসদ, অস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তার পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জয়মনির ঘোল এলাকায় অবস্থিত কোস্ট গার্ড স্টেশনে একদল দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এতে দায়িত্ব পালনরত কয়েকজন কোস্ট গার্ড সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে যৌথ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
ব্রিফিংয়ে পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম (সি), পিসিজিএম, পিএসসি, বিএন বলেন, কোনো অপপ্রচার, গুজব বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাই বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডকে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। দেশের সার্বভৌমত্ব, সমুদ্রসীমা, উপকূলীয় অঞ্চল ও সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতেও একই দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে অভিযান ও নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
-20260612130633.webp)

