প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব।’ তিনি শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে বলেন, জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের পরিবার ও যোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান, স্বীকৃতি ও জীবনমান নিশ্চিতকরণ, পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদানে সরকার কাজ করছে।
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন।
জুলাই শহীদদের হত্যাকারীদের বিচার এ দেশের মাটিতেই হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমি প্রথমেই বলেছি রাষ্ট্র-দেশ তার যথাসাধ্য দিয়ে আপনাদের মূল্যায়নের চেষ্টা করবে, আপনাদের আত্মত্যাগকে মূল্যায়ন করবে। কিন্তু একই সঙ্গে আপনাদের আত্মত্যাগ যেভাবে মূল্যায়ন করবে, আপনাদের বিরুদ্ধে যে অন্যায় হয়েছে, যেভাবে আপনাদের আপনজনকে হত্যা করা হয়েছে, অবশ্যই তার জন্য দায়ীদের বিচার হবে এই দেশের আইনে।’
তিনি আরও বলেন, সবার উদ্দেশে বলতে চাই, আপনাদের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে শুধু আমার দলেরই নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং একই সঙ্গে যে সকল অরাজনৈতিক ব্যক্তি যারা ৫ আগস্ট (ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন আন্দোলন) সফল করেছিলেন, তাদের সবার কাছে বলতে চাই—আসুন, আমাদের প্রতি, বাংলাদেশের লক্ষ-কোটি মানুষের প্রতি স্বৈরাচার যেমন অবিচার করেছিল, বিচারের নামে কারও প্রতি যেন অবিচার না হয়, সে বিষয়টিতেও সচেতন থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘এই অনুষ্ঠান চলাকালে আমি বারবার ভাবছিলাম—এই মুহূর্তে যদি আমি আমার মাকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, আপনার ওপর যে অবিচার ও অন্যায় হয়েছে, আপনি কি চান আমি এসবের প্রতিশোধ নিই? আমার বিশ্বাস মা বলতেন, এই মুহূর্তে তোমার কাজ সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি জানি, আমার ভাইকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও আমাকে একই উত্তর দিতেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি, এখানে মা উপস্থিত আছেন। তিনি দেখেছেন কীভাবে সন্তানকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এখানে ভাই উপস্থিত আছেন, তিনি দেখেছেন কীভাবে তার ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’
‘আপনাদের এই কষ্টের বিপরীতে শুধু একটি কথাই আমি বলতে চাই, আপনাদের যে কষ্ট, সেই কষ্টটি আমিও বুঝি, অনুভব করতে পারি।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বৈরাচারের সময় থেকে শুরু করে ৫ আগস্টের জুলাই আন্দোলনে অনেকেই, বহু, হাজারো-লক্ষ মানুষ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সেই নির্যাতনের যে কষ্ট আপনাদের এখনো ভোগ করতে হচ্ছে, সেরকম শারীরিক ও মানসিক কষ্ট আমাকেও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এ কারণে আপনাদের সেই কষ্ট—সেটি মানসিক হোক বা শারীরিক হোক—আমি কিছুটা হলেও অনুভব করতে সক্ষম।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, শহীদ হয়েছেন, তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন। তাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৫ আগস্ট যে অর্জন আমরা করেছি, তা একক কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়—এটি দেশের প্রতিটি গণতন্ত্রকামী মানুষের অর্জন, জনতার সম্মিলিত ত্যাগের ফসল।’
তিনি বলেন, ‘আপনাদের ডান দিকে একটি ব্যানারে লেখা আছে—জুলাইয়ের শহীদ হওয়া সর্বকনিষ্ঠ ফুলগুলোর নাম। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৬৫ জন শিশু শহীদ হয়েছিল। তাদের কি কোনো অপরাধ ছিল? তাদের অপরাধ ছিল না। কিন্তু দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করতে গিয়ে এই শিশুগুলো জীবন দিয়েছে।’
সেই উত্তাল দিনগুলোর প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন যে, জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। সেই উত্তাল দিনগুলোতে যতটুকু সম্ভব হয়েছে, আমি বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়েছি। অনেকে অনেক হিসাব দিয়েছে। কিন্তু আমার হিসাব অনুযায়ী, শুধু জুলাই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন প্রায় ২ হাজার মানুষ, আর প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’
ফ্যাসিস্ট শাসনামলে দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন, মামলা-হামলার ঘটনা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ আপনাদের সকলের কাছে একটু সহযোগিতা চাই—যে আপনজনকে আপনারা হারিয়েছেন, তারও তো লক্ষ্য ছিল এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতিকে এগিয়ে নিতে ত্যাগ স্বীকার করার মতো শক্তি ও সাহস বিএনপির আছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দল, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দল, বাংলাদেশের অস্তিত্বে যারা বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের গণতন্ত্রে যারা বিশ্বাস করে—আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বিশ্বাস করি, এইরকম প্রত্যেকটি মানুষের সেই সাহস ও শক্তি আছে।’
জাতিকে বিভক্ত করে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেই মানুষই ত্যাগ করতে পারে, যার সাহস আছে। আপনজনকে আপনারা হারিয়েছেন—যে অঙ্গ হারিয়েছেন তা কি ঠিক হবে? না, তা ঠিক হবে না। তবে সবাই মিলে আমরা যদি এ দেশকে এগিয়ে নিতে পারি, তবে একদিন গর্ব করে বলতে পারবেন—আপনজনের ত্যাগের বিনিময়ে দেশের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য, মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই দেশ, এই দেশের জনগণ, এই দেশের মাটি। তাই আসুন, আমরা চেষ্টা করি যাতে আর কোনো কিছু বা কোনো শক্তি আমাদের এই লক্ষ্য অর্জন থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।’
অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাদের যন্ত্রণা ও অনুভূতি প্রকাশ করেন। পুরো গ্যালারি ভারী হয়ে ওঠে আবেগে।

