ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬

শেরপুরবাসী ট্রেনের হুইসেল শুনবে কবে?

মো. সলিমুল্লাহ সেলিম
প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০২:০৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের উন্নয়নের মহাসড়কে যখন একের পর এক জেলা যুক্ত হচ্ছে রেল নেটওয়ার্কে, তখনো উত্তরাঞ্চলের সম্ভাবনাময় জেলা শেরপুর রয়ে গেছে রেলবঞ্চিত। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এ জেলার মানুষের কাছে রেললাইন এখনো বাস্তবতার চেয়ে প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ। অথচ এই রেলপথ শুধু একটি জেলার যোগাযোগব্যবস্থাই বদলে দেবে না; পাল্টে দিতে পারে বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, পর্যটন ও সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্যের চিত্র।

ময়মনসিংহ-শেরপুর-শ্রীবরদী-বকশীগঞ্জ-রৌমারী ও রাজিবপুর রেললাইন নির্মাণের দাবি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষ ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে আসছেন। মানববন্ধন,  সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং, স্মারকলিপি প্রদান, ব্যানার-পোস্টার, সংবাদ প্রকাশ, বিভিন্ন সময়ে রেল মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদনসহ—দাবি আদায়ের গণতান্ত্রিক প্রায় সব কর্মসূচিই পালন করা হয়েছে। সাংবাদিক সলিমুল্লাহ সেলিম, এম. শাহীন আল আমীন, মহিউদ্দিন সোহেল, মাসুদ হাসান বাদলসহ স্থানীয় সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, কৃষক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং দলমত-নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ এই দাবির সঙ্গে আজ একাত্ম। অথচ প্রায় ১০ লাখ মানুষের প্রত্যাশার এই প্রকল্পটি আজও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।

২০১৪ সালে রেললাইন নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এরপর কেটে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়। কিন্তু সমীক্ষা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বাইরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে মানুষের প্রশ্ন—আর কত বছর অপেক্ষা করলে শেরপুরবাসী ট্রেনের হুইসেল শুনতে পাবে?

সম্প্রতি সরকার ঘোষণা দিয়েছে, শেরপুরসহ দেশের ১০টি জেলা পর্যায়ক্রমে রেল যোগাযোগের আওতায় আনা হবে। এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা মানুষকে সতর্ক করে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। তাই এবার মানুষ নতুন ঘোষণা নয়, দৃশ্যমান কাজ দেখতে চায়।

প্রস্তাবিত এই রেলপথ বাস্তবায়িত হলে শেরপুর জেলার তিনটি উপজেলা, জামালপুর জেলার দুটি উপজেলা, ময়মনসিংহের কয়েকটি উপজেলা এবং কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যাতায়াত সহজ হবে। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও দ্রুত পরিবহনের সুবিধা পাবেন।

এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও ব্যাপক। শেরপুর ও জামালপুর অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। ধান, পাট, আখ, তামাক, সরিষা, ডাল, চীনাবাদাম, ডিম, চামড়া, পান ও হস্তশিল্পসহ বিপুল পরিমাণ পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। রেলপথ চালু হলে এসব পণ্য কম খরচে দ্রুত পরিবহন করা সম্ভব হবে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে, বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ বাড়বে।

একই সঙ্গে নাকুগাঁও, ধানুয়া কামালপুর ও রৌমারী স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। রেল সংযোগ যুক্ত হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ সহজ হবে, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে।

শেরপুর শুধু কৃষির জেলা নয়; এটি পর্যটনেরও এক অপার সম্ভাবনার জনপদ। গজনী অবকাশ, মধুটিলা ইকোপার্ক, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চল, বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই জেলার পর্যটন শিল্প এখনো যোগাযোগ সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত বিকাশ লাভ করতে পারেনি। একটি আধুনিক রেললাইন এই সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শেরপুর বর্তমানে দেশের এমন কয়েকটি জেলার অন্যতম, যার সঙ্গে অন্য জেলার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম সড়কপথ। নেই রেল, নেই নৌপথ, নেই বিমান যোগাযোগ। একটি জেলার জন্য এমন বাস্তবতা শুধু উন্নয়নের অন্তরায় নয়; এটি আঞ্চলিক বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি।

রেলপথ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অবকাঠামো। একটি রেললাইন কেবল মানুষ পরিবহন করে না; এটি অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও শিল্পায়নের গতিপথও বদলে দেয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো আঞ্চলিক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে রেলকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বাংলাদেশও সেই পথেই এগোচ্ছে। তাই শেরপুরকে আর উন্নয়নের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

বর্তমানে শেরপুরে রেললাইন কোন রুট দিয়ে হবে—তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের জনদাবি অনুযায়ী ময়মনসিংহ-শেরপুর-শ্রীবরদী-বকশীগঞ্জ হয়ে রৌমারী ও রাজিবপুর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণই হবে সবচেয়ে কার্যকর, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং সর্বাধিক জনগোষ্ঠীর উপকারে আসা প্রকল্প। এই রুট বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় একটি নতুন করিডর সৃষ্টি হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

শেরপুরের মানুষ আর নতুন প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা চায় প্রকল্প অনুমোদনের সরকারি প্রজ্ঞাপন, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, টেন্ডার আহ্বান, নির্মাণকাজের সূচনা এবং বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সূচি। কারণ উন্নয়ন কেবল ঘোষণায় আসে না; উন্নয়ন আসে বাস্তবায়নে।

এখন সময় এসেছে প্রতিশ্রুতির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে বাস্তবতার পথে হাঁটার। ময়মনসিংহ-শেরপুর-শ্রীবরদী-বকশীগঞ্জ-রৌমারী-রাজিবপুর রেললাইন কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, ন্যায্য অধিকার এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আর কোনো বিলম্ব হওয়ার সুযোগ নেই।