ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

স্বস্তিতে নেই বিএনপি সরকার, জ্বালানিমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ আসছে ব্যাপক রদবদল

মেহেদী হাসান খাজা
প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৬, ০৩:৫৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে খুব একটা স্বস্তিতে নেই বিএনপি সরকার।  সঙ্গে ছিল বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আর আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা।  তারওপর ‘হানিমুন পিরিয়ড’ পার হওয়ার আগেই মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের ‘বেফাঁস মন্তব্যে’ ও দূর্নীতির গুজনে বিব্রত সরকার।  ভাবমূর্তি রক্ষায় মন্ত্রিসভায় আসছে বড় রদবদল।

সরকার প্রধান অনেককেই নজরদারিতে রেখেছেন এবং সরকারের বিশেষ গোয়েন্দারা এসব বিষয়ে কাজ করছেন। গোয়েন্দা কর্তকর্তারা সরকারকে ইতিমধ্যে বেশ কিছু মন্ত্রী ও মন্ত্রীর তথ্য সামনে এনেছেন। এরমধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে নানা ধরণের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সেগুলো নিয়ে সরকার প্রধান কাজ করছেন এবং মন্ত্রী পরিষদের বড় ধরেণের রদবদল আসছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা সমালোচনা তৈরি হচ্ছে।

সূত্র মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। পরে নতুন মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী হন ২৪ জন।  তাদের মধ্যে কয়েকজন আলোচনায় না থেকেই প্রতিমন্ত্রী হন। আলোচনায় না থেকে যারা প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন তারা হলেন- সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী রবিউল ইসলাম রবি, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এছাড়াও রয়েছেন প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম, ফরহাদ হোসেন আজাদ, মো. রাজিব আহসান, মো. আব্দুল বারী, শেখ ফরিদুল ইসলাম, ইয়াসের খান চৌধুরী, এম ইকবাল হোসেইন, এমএ মুহিত, আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর ও আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম।  সরকার ও দলীয় সূত্র মতে এরমধ্যে বেশ কয়েকজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব হারাতে পারেন।  

মন্ত্রিসভায় বেশ কয়েকজন প্রবীণ ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ যুক্ত হতে পারেন বলে জানিয়েছে বিএনপি ও সরকারের একাধিক সূত্র।  নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের এক নেতা বলেন, মন্ত্রীদের অতি উৎসাহী বক্তব্যে দল বিব্রত।  বিষয়টি খোদ প্রধানমন্ত্রীরও দৃষ্টি এড়ায়নি।  অনেকের ওপর হয়তো অধিক দায়িত্বের বোঝা চেপে আছে।

সঙ্গত কারণেই বেশ কিছু মন্ত্রীর দায়িত্ব পুনর্বণ্টন হওয়ার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে।
বিএনপির এই নেতা বলেন, যাদের হাতে দুই থেকে তিনটি মন্ত্রণালয় রয়েছে তাদের ক্ষমতা কমবে।

মন্ত্রিসভা থেকে কেউ বাদ পড়ছেন কিনা এমন প্রশ্নে সরাসরি জবাব না দিয়ে বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রভাবশালী নেতা রূপালী বাংলাদেশকে জানান, এসব বিষয়ে কথা বলা যাবে না।  তবে রদবদল হচ্ছে।  তবে খুলনা বিভাগের এক প্রতিমন্ত্রী সম্ভবত মন্ত্রী পরিষদ থেকে বাদ পড়তে পারে।  এর কারণ হলো দলের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে তার জন্য বিএনপির খুলনা বিভাগে বাজে ভাবে নির্বাচনে হেরেছে এবং সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে গোল্ড অপরাধের একটি অভিযোগ সরকার আমলে নিয়ে গোয়েন্দাদের তদন্তের নির্দেশনা দিয়েছেন বলে দলের ভেতরে ও বাইরে বেশ আলোচিত।  

নাম প্রকাশ করার শর্তে সরকারের এক মন্ত্রী রূপালী বাংলাদেশকে জানান, মন্ত্রী পরিষদ থেকে রবিউল ইসলাম রবি, মো. রাজিব আহসান, হাবিবুর রহমান হাবিবসহ বেশ কয়েকজন হয়তো কয়েকজন রদবদল অথবা বাদ পড়তে পারেন।  আবার সরকার প্রধান না চাইলে অথবা সময় সংকেত দিয়ে তাদের সতর্কও করতে পারেন।  তবে এটা সঠিক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী সরকার থেকে বাদ পড়ছেন অনেকেই, আবার দলীয় পদ হারাতেও পারেন কেউ কেউ।  

বিএনপি ও সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, মন্ত্রিপরিষদে জায়গা পেতে যাচ্ছেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান এবং সেলিমা রহমান, ড. এনামুল হক চৌধুরী।  এছাড়া দলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল ও সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও বর্তমান চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহিদুর রহমানের নামও শোনা যাচ্ছে।

মন্ত্রীদের ‘বেফাঁস মন্তব্য’ ও দূর্নীতির তথ্য

বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার নবীন এবং প্রবীণ বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।  সম্প্রতি লোডশেডিং এবং বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল হয়।  বিশেষ করে গ্রামে লোডশেডিং নিয়ে তার বক্তব্য বিভিন্ন মহলে ‘হাস্যরসের’ খোরাক জোগায়। 

এছাড়া আরো আরেক মন্ত্রী ছিটকে পড়বেন বলে মনে করেন অনেকেই তিনি হলেন সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সাখাওয়াত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।  তিনি হাম ইস্যুতে ব্যাপক বিতকৃত মন্তব্য করে সরকারকে বিপদে ফেলে দিয়েছেন।  

গত ৫ মে গ্রামে লোডশেডিং নিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, গ্রামে কোনো লোডশেডিং নেই, যেটা হয় সেটা পল্লীবিদ্যুতের লম্বা লাইনের জন্য।  কারণ সেখানে ত্রুটি হলে খুঁজে সংস্কার করতে সময় লাগে।  এ জন্য বিদ্যুৎটা আসে না।  আবার লাইন ঠিক হয়ে গেলে বিদ্যুৎ চলে আসে।

গরমে তীব্র লোডশেডিংয়ে গ্রাম এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভেরও জন্ম দেয়। অনেকে এটিকে গ্রামের মানুষের কষ্টের সঙ্গে মশকরা বলেও অভিহিত করেন।  এর আগে সংসদে বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলেছিলেন, চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই।  

দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের একটি বক্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। তিনি বলেছিলেন, পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে টাকা তোলা-কে সরাসরি ‘চাঁদাবাজি’ বলা ঠিক হবে না। এটি মূলত সংগঠন পরিচালনার জন্য একটি ‘সার্ভিস চার্জ’।  সড়কে দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ গাড়িচালক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ মন্ত্রীর এই ধরনের বক্তব্যে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়।  ঈদুল ফিতরের আগেও ‘ঈদযাত্রায় কোথাও বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না’ বক্তব্য দিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন সড়ক মন্ত্রী।  গত ১৫ মার্চ রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, কোথাও কেউ বেশি ভাড়া নিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও ২০, ৩০ বা ৫০ টাকা কম নেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর সাধারণ যাত্রী, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়।  সে সময় সাধারণ যাত্রীরা প্রতিটি রুটেই নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। 

এই তোমরা কেমন আছো? ভালো? পড়ালেখা কর তো? করতে হবে, নকল আর হবে না। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের এই বক্তব্য নিয়েও ব্যাপক ট্রল হয়।  বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় অতীতের মতো নকলের কোনো সুযোগ না থাকলেও, মন্ত্রীর গৎবাঁধা বক্তব্যে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহলে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।  

সরকার ও বিএনপির গুলশান অফিসের সূত্র মতে , খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।  তিনি ও মন্ত্রী হারাতে পারেন।  তার বিরুদ্ধে নানা ধরণের অভিযোগ ও একক দায়িত্ব নিয়ে নানা ধরণের প্রশ্ন রয়েছে। 

এছাড়া জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে সরকার আরো বিপদে ফেলেছেন।  তিনি গোল্ড চক্র ও যশোরের অপরাধ চক্র নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগের পাহাড় রয়েছে।  এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর যশোর সফরের সময় অনুষ্ঠান মাঠে তেমন লোকবল দেখাতে ব্যার্থ হন পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের সময়ে প্রায় বিএনপি সরকারকে বেকায়দায় ফেলছেন।  তখন বিএনপি একেবারেই নতুন সরকার গঠন করে ঠিক এমন সময় তিনি জনম্মুখে আজেবাজে মন্তব্য করে সরকারকে জনসংকটে ফেলেন।  যদিও সরকার এটা কোনো ভাবে টিকে থেকে সংকট মোকাবেলা করেন। 

মন্ত্রীদের বেফাঁস মন্তব্য নিয়ে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সচিব সিনিয়র সাংবাদিক মারুফ কামাল খান বলেছেন, রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা একটা বড় ব্যাপার।  সব কথা রাজনীতিতে বলা যায় না, কূটনীতির যেমন পরিভাষা আছে রাজনীতিরও তেমনি কিছু পরিভাষা আছে। কোথায় কখন কী বলা উচিত, কী বলা উচিত নয় এসব বিষয়ে কিছুটা ঘাটতি থাকলেই এমন সমস্যা হয়।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেছেন, মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনেক সময় অনেক কথা বলে ফেলে, তার মধ্যে শব্দচয়নে যদি ছোটখাটো দু-একটা ভুলত্রুটি হয়ে যায়, তা বড় করে দেখার কিছু নেই।  মন্ত্রিসভায় রদবদল নিয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় নতুন করে কাউকে নেওয়া এবং পুরোনো কাউকে বাদ দেওয়া এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। একটি নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভায় কখন কাকে মন্ত্রী বানাবে অথবা কাকে মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দেবে, এটি নিতান্তই প্রধানমন্ত্রীর বিষয়।

‘বেফাঁস মন্তব্য’ ইস্যুতে রাজনীতি বিশ্লেষক মেজর (অব.) ইমরান বলেন, বিরোধী দলের কর্মীরা পিলার নাড়াচাড়া করে রানা প্লাজা ধসিয়ে দিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়নি, বন্ধ হয়ে গেছে ইত্যাদি নানা মনগড়া প্রলাপ আমরা অতীতে আওয়ামী আমলের মন্ত্রীদের কাছে শুনেছিলাম। কিন্তু ফ্যাসিস্টের পতনের পরও যদি মন্ত্রীদের কাছে এসব শুনতে হয়, তাহলে পরিবর্তনটা হলো কোথায়?

দু-চারজন মন্ত্রীর বক্তব্যে পুরো মন্ত্রিসভা তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং জনগণের মাঝে ভুল বার্তা যেতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।  সিনিয়র সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, অতিকথন সব সময়েই বিপদ। বিশেষ করে দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে অনেক বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। অতীতেও আমরা দেখেছি অনেক মন্ত্রী-এমপিকে এই অতি উৎসাহী বক্তব্যের জন্য খেসারত দিতে হয়েছে, কিন্তু দুঃখজনক সত্য হচ্ছে আমরা কেউই অতীত থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না।

আসছে বড় পরিবর্তন, মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়ার আলোচনায় নতুন মুখ: 

প্রথমবারের মতো পঞ্চাশ সদস্যের মন্ত্রিসভা নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারে আসতে পারে বড় পরিবর্তন।  আলোচনা চলছে মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানো ও দফতর পুনর্বিন্যাস নিয়েও। এর আগে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ৪৬ সদস্যের মন্ত্রিসভা করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ জনে।  এবারেরটাও ধীরে ধীরে বাড়বে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, এটা কোনো বিচিত্র ব্যাপার না, খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। মানে সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু তার মানে এই না যে, এটা হবেই বা এখন হবে কিংবা তখন হবে। এগুলো নিয়ে কথা বলার ক্ষমতা একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর। তিনি যখন উপযুক্ত বিবেচনা করবেন, তখন কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন বা কারও থেকে দায়িত্ব নিতে পারেন।  বেসরকারি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাশেদুজ্জামান মিল্লাত বললেন, কী হবে, তা আমরা জানি না।  অনেকে মন্ত্রী হবেন, হতে পারেন, রদবদল ও হবে এসব তো হয়।

মন্ত্রিসভায় এখন ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী।  একাধিক মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছে ৮ মন্ত্রী ও ৩ প্রতিমন্ত্রী।  তাদের ওপর কাজের চাপ কমানো ও সরকারের কাজে গতিশীলতা আনতে আটজন নতুন মুখকে বিবেচনা করা হচ্ছে।   মন্ত্রিপরিষদে কারা যুক্ত হতে পারেন, সেই আলোচনায় আছেন সংসদ সদস্য আবদুল মঈন খান, বরকত উল্লাহ বুলু, জয়নুল আবদিন ফারুক, এরশাদ উল্লাহ, বি এম মোশাররফ হোসেন, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সেলিমা রহমান, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও গোপালগঞ্জ-১ আসনের এমপি সেলিমুজ্জামান সেলিম এবং টেকনোক্রেট কোটায় মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও মাহিদুর রহমান।

কোণঠাসা প্রবীণ বিএনপি নেতারা: মূল্যায়িত হতে পারে সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায়

এদিকে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, লাখো মামলা, অমানবিক নির্যাতন আর জেল-জুলুম পার করে অবশেষে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কিন্তু দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলেও দলের ভেতরেই তৈরি হয়েছে এক নতুন সমীকরণ।  রাজপথের অনেক প্রবীণ ও ত্যাগী নেতা আজ নিজেদের দলেই ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।  নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তরুণদের প্রভাব বাড়তে থাকায় অভিজ্ঞরা পড়ছেন ছিটকে। তবে হতাশার এই ঘোর অন্ধকারের মাঝেই উঁকি দিচ্ছে নতুন আশার আলো।  জানা গেছে, ঈদুল আজহা ও বাজেট অধিবেশনের পর মন্ত্রিসভার যে সম্প্রসারণ হতে যাচ্ছে, সেখানে দলের এই ত্যাগী ও প্রবীণ নেতাদের মূল্যায়নের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর যখন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়, তখন অনেকেই চমকে গিয়েছিলেন। দলের যে প্রবীণ নেতারা বিগত দেড় যুগ ধরে বুক চিতিয়ে দলকে আগলে রেখেছিলেন, তাদের অনেকেই মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি।  ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রীর মধ্যে মাত্র ছয়জন পূর্বে বিএনপি সরকারে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতো হেভিওয়েট নেতারা প্রথম দফার মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন। পরবর্তীতে মির্জা আব্বাসকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হলেও কোনো সুনির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়নি। প্রবীণ নেতা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে স্পিকার করে কার্যত দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার প্রেক্ষিতে তিনি স্থায়ী কমিটি থেকে পদত্যাগও করেছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, সরকার ও দলের নীতিনির্ধারণীতে এখন লন্ডনভিত্তিক তরুণ নেতাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সরকার বা দল পরিচালনার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তারা এখন ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। অনেক সিনিয়র নেতার মতে, তারেক রহমান বিশ্বাস করেন— বিদেশ থেকে শিক্ষিত এই তরুণরা আরও আধুনিক ও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা নিয়ে এসেছেন এবং দলের ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য তারাই বেশি যোগ্য। একসময় প্রভাবশালী থাকা সিনিয়র নেতাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী অস্বস্তিবোধ করেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র নেতার ভাষায়, "পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, চেয়ারম্যান নিজেই বয়স্কদের অবসরে পাঠাচ্ছেন।" এই পরিবর্তনের আভাস পেয়ে খোদ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বয়সের কারণ দেখিয়ে শিগগিরই অবসরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "আমার বয়স বাড়ছে। আমি দীর্ঘদিন ধরে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছি। এখন একটি পরিবর্তন দরকার।"

২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে বিএনপির প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীকে দেড় লাখ মামলায় আসামি করা হয়েছে। যাদের অনেকেই আজ নিঃস্ব। বাড়িঘর, জমিজমা, এমনকি গবাদিপশু বিক্রি করে, ঢাকায় রিকশা চালিয়েও অনেকে আন্দোলনের খরচ জুগিয়েছেন। আতঙ্কে অসংখ্য রাত কেটেছে ধানখেতে, খোলা আকাশের নিচে, সুপারি বাগানে কিংবা কবরস্থানে।

দলের অনেক ত্যাগী নেতার অভিযোগ, দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হলে ত্যাগের স্বীকৃতি মিলবে— এমন প্রত্যাশা থাকলেও সরকার গঠনের পর তাদের ভাগ্য বদলায়নি। বরং আন্দোলনের সময় যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীই এখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে নিচ্ছে।

ত্যাগী নেতাদের বঞ্চনার অন্যতম উদাহরণ দলের সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, যুগ্মমহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে দলের হাল ধরা রিজভীকে মন্ত্রী না করে কেবল উপদেষ্টা করায় অনেকেই বিস্মিত। সাড়ে চারশ মামলার আসামি হাবিব উন নবী খান সোহেল দীর্ঘ সময় কারাগার ও আদালতে কাটালেও তাকে এখনো কোনো পদে মূল্যায়ন করা হয়নি।

তিন শতাধিক মামলার আসামি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল রিমান্ডে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিনা চিকিৎসায় তার একটি কিডনি অকেজো হয়েছে। ২০০১ সালে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে বিদ্ধ আলাল এখনো শরীরে গুলির ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। মায়ের মৃত্যুর সময় কারাগারে থাকায় শেষবার মায়ের মুখটাও দেখতে পারেননি। এত ত্যাগের পরও সরকারে তাকে মূল্যায়ন না করায় তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।

অবশ্য আলাল এখনো আশাবাদী। তিনি বলেন, "তারেক রহমান নিজে আমাদের ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে উৎসাহিত করেছেন। তিনি সবকিছু অবগত রয়েছেন। চেয়ারম্যান যথাসময়েই দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের পুরস্কৃত ও সম্মানিত করবেন বলে আমার বিশ্বাস।"

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আমাদের দলের প্রত্যেক নেতাকর্মীর ত্যাগ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। সবেমাত্র সরকার গঠন হয়েছে। দেশ গঠনের কাজ চলমান। আশা করি একটা সময় কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের ত্যাগী নেতারা মূল্যায়িত হবেন।"

সরকারের পাশাপাশি দলের ভেতরেও বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। এ বছরের শেষের দিকে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি হিসেবে দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ পরবর্তী মহাসচিব হতে পারেন বলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।

স্থায়ী কমিটি থেকেও বয়স্ক ও অসুস্থ নেতাদের সরিয়ে তরুণদের জায়গা দেওয়া হতে পারে। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া এবং সেলিমা রহমানকে স্বাস্থ্যগত কারণে স্থায়ী কমিটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া নব্বইয়ের দশকের ছাত্র আন্দোলনের অনেক নেতা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে জায়গা পেতে পারেন।

সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় মূল্যায়নের সম্ভাবনা: 

প্রাথমিক বঞ্চনা ও হতাশার মধ্যেই দলের ত্যাগী ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের জন্য সুসংবাদ হয়ে আসছে আসন্ন মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ। সরকার ও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, জনবান্ধব ও প্রশাসনের গতি বাড়াতে ঈদুল আজহা এবং বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার পরই মন্ত্রিসভার আকার বাড়তে যাচ্ছে। আর এই সম্প্রসারণেই দলের পোড়খাওয়া ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে।

সূত্রমতে, নতুন মন্ত্রিসভায় কয়েক দশকের অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান এবং রাজপথের পরীক্ষিত নেতাদের দেখা যাবে। নোয়াখালী অঞ্চল থেকে মন্ত্রিসভায় কোনো প্রতিনিধি না থাকায় প্রবীণ রাজনীতিবিদ, ছয়বারের সংসদ সদস্য ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের নাম জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে।

এছাড়া তৃণমূলের দাবি মেনে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং হাবিবুন নবী খান সোহেলের মতো হেভিওয়েট নেতারা। প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীকেও পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

এর বাইরে হুইপের দায়িত্ব পালন করা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, পাবনার সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাক এবং কুমিল্লার অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার নামও পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তরুণ ও উদীয়মান নেতাদেরও সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এই তালিকায় রয়েছেন খুলনার সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল এবং ফরিদপুরের শহিদুল ইসলাম বাবুল। পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হতে পারেন দলের মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ও প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেল। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেও দু-একজনকে মন্ত্রিসভায় আনা হতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করে, সরকার পরিচালনার শুরুতেই প্রবীণ ও ত্যাগীদের বাদ দিয়ে তরুণদের ওপর নির্ভরতা দলে কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সৃষ্টি করেছিল। তবে তারেক রহমান খুব ভালো করেই জানেন, শুধু তারুণ্যের উচ্ছ্বাস দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র চালানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রবীণদের মেধা, প্রজ্ঞা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। আসন্ন মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ সেই ভারসাম্য রক্ষারই একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। রাজপথে রক্ত ঝরানো এই প্রবীণ ও ত্যাগী নেতারা যদি সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় যথাযথভাবে মূল্যায়িত হন, তবে দলের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশা যেমন দূর হবে, তেমনি দেশ গঠনেও তা এক নতুন মাত্রার যোগ করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।