বিশ্ব ক্রিকেট যখন ওডিআইতে ৪০০ রানের এভারেস্ট জয়ের নেশায় মত্ত, যখন ব্যাটারদের ব্যাট থেকে আগ্নেয়গিরির লাভা ঝরছে, ঠিক তখন বাংলাদেশের ক্রিকেট যেন এক আদিম গুহায় আশ্রয় নিয়েছে!
গত শুক্রবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচ ওডিআই সিরিজের প্রথম ম্যাচে ডিন ফক্সক্রফটের সাধারণ মানের এক ডেলিভারিতে লিটন দাসের এভাবে বোল্ড হওয়াটা কেবল উইকেট পতন নয়—এটি আসলে আধুনিক ক্রিকেটের গতির কাছে বাংলাদেশের নাভিশ্বাস ওঠার চূড়ান্ত নিদর্শন।
লিটন দাস, আফিফ হোসেন, নাজমুল হোসেন শান্ত, মেহেদী হাসান মিরাজ—এদের নামের ভার যতটা, পারফরম্যান্সের পাল্লা ততটাই হালকা। যে লিটন ১১ বছর ধরে জাতীয় দলে খেলছেন, তার ওয়ানডে গড় এখনো ৩০-এর কোঠায় আটকে থাকাটা স্রেফ বিস্ময়কর নয়, বরং লজ্জাজনক।
টানা ১৮ ইনিংসে নেই কোনো ফিফটি! আফিফ হোসেন তো যেন ভুলেই গেছেন বাউন্ডারি কাকে বলে; ৪৯ বল খেলে কোনো বাউন্ডারিহীন ২৯ রানের ইনিংস খেলাটা আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটে স্রেফ ‘ক্রাইম’। আর সাবেক অধিনায়ক শান্তর ১৩ ইনিংসের ফিফটি খরা প্রমাণ করে, দলের মেরুদণ্ড কতটা ভঙ্গুর। এদিকে, অধিনায়ক মিরাজ তো ভুলেই গেছেন ব্যাট চালাতে!
ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা তো অনেক দূরের কথা, আফগানিস্তানও যেখানে পাওয়ার হিটিং দিয়ে বিশ্ব শাসন করতে শিখছে, সেখানে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা এখনো ‘উইকেটে পড়ে থাকা’র প্রাচীন তত্ত্বে বিশ্বাসী।
আধুনিক ওয়ানডে এখন আর কেবল টিকে থাকার খেলা নয়, এটি শাসন করার খেলা। অথচ আমাদের তারকা ক্রিকেটাররা মন্থর উইকেটে বলের ফ্লাইট বুঝতে না পেরে থমকে দাঁড়াচ্ছেন। বিশ্ব ক্রিকেটের ব্যাকরণ যখন প্রতি বলে রানের দাবি জানাচ্ছে, তখন আমাদের ব্যাটাররা ডট বলের পাহাড় বানিয়ে প্রতিপক্ষকে জয় উপহার দিচ্ছেন।
বাংলার ক্রিকেটে কেন এই অধঃপতন?
দেশের ক্রিকেটের এই অধঃপতনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী মিরপুরের মরা উইকেট! এই জাদুর উইকেটে কায়দা করে মাঝেমধ্যে জয় ছিনিয়ে এনে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা আত্মতৃপ্তিতে নাচে। কিন্তু বিদেশের স্পোর্টিং ট্র্যাকে যখন বল বুক সমান উচ্চতায় আসে, তখন টাইগারদের টেকনিকের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ে।
এর পাশাপাশি দেশের ক্রিকেটে নেই কোনো জবাবদিহিতা, টানা ১৭-১৮ ইনিংস ব্যর্থ হওয়ার পরও যখন একজন ক্রিকেটার ‘অটো চয়েস’ হিসেবে দলে থাকেন, তখন দলের ভেতরকার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। সৌম্য সরকার, মোসাদ্দেক ও সাব্বির রহমানের মতো বিকল্পরা বাইরে পচছেন, আর মাঠে থাকা ‘প্রিভিলেজড’ ক্রিকেটাররা ব্যর্থতাকে অভ্যাসে পরিণত করেছেন।
বর্তমান সময়ে এসে বড় দলগুলো যখন একদিনের ক্রিকেটে ৩৫০-৪০০ রান তাড়া করার সাহস দেখায়, তখন বাংলাদেশ ২৫০ রান দেখলেই ম্যাচ হেরে বসে। এই রক্ষণাত্মক মানসিকতা আমাদের ক্রিকেটের উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় শিকল।
সিরিজ জয় দিয়ে মাঝেমধ্যে সত্য আড়াল করা গেলেও টাইগারদের ব্যাটিংয়ের এই মরণদশা দীর্ঘমেয়াদে ঢাকবার কোনো উপায় নেই। তাই দিনশেষে বলা যায়, বিশ্ব ক্রিকেট যখন রকেট গতিতে চলছে, বাংলাদেশ তখন গরুর গাড়িতে!

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন