বাংলাদেশের গণমাধ্যমে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে ঘিরে যে পরিমাণ বিশ্লেষণ, আলোচনা ও সংবাদ প্রকাশিত হয়, তা অনেক সময় দক্ষিণ আমেরিকার এই দুই দেশের নিজস্ব গণমাধ্যমের কভারেজকেও ছাড়িয়ে যায় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক সাংবাদিকেরই পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা নিয়ে যে মাত্রার আগ্রহ দেখা যায়, তা বিশ্বের খুব কম দেশেই দেখা যায়।
এর প্রধান কারণ একটাই—পাঠকদের ব্যাপক চাহিদা। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কোনো দল অংশগ্রহণ না করলেও প্রতিটি আসরে দেশ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাংবাদিক টুর্নামেন্ট কাভার করতে যান। তাদের প্রতিবেদনের বড় অংশজুড়েই থাকে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার খবর, বিশ্লেষণ এবং ভক্তদের প্রতিক্রিয়া।
ভৌগোলিক, রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকার এই দুই দেশের বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই। তবুও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। অনেকের কাছে এটি শুধু সমর্থন নয়, বরং আবেগের নাম।
বিশ্বকাপ এলেই সেই আবেগ আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাদে ছাদে উড়তে দেখা যায় প্রিয় দলের পতাকা। দেয়ালজুড়ে আঁকা হয় গ্রাফিতি, আর চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই চলে তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা।
বাংলাদেশের এই ফুটবল উন্মাদনা এখন আর দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। ডিজিটাল যুগের কল্যাণে ভক্তদের নানা কর্মকাণ্ড পৌঁছে যাচ্ছে হাজার মাইল দূরের আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলেও। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ চলাকালে এক সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা সম্পর্কে তিনি অবগত।
শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে আর্জেন্টিনায় ক্রিকেট দল গঠনের উদ্যোগও দেখা গেছে। এমনকি দেশটিতে বাংলাদেশের পতাকা হাতে উদ্যাপন ও মিছিলের ঘটনাও নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের।
বাংলাদেশে কার সমর্থক বেশি?
বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশ যেন দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে—একদিকে আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ব্রাজিল। ফলে প্রশ্নটি প্রায়ই আলোচনায় আসে—বাংলাদেশে আসলে কোন দলের সমর্থক বেশি?
তবে এ বিষয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য জাতীয় জরিপ প্রকাশিত হয়নি। ফলে নিশ্চিতভাবে কোনো পক্ষকে এগিয়ে রাখা কঠিন।
তবে অনলাইনে পরিচালিত বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক জরিপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা, গুগল সার্চ ট্রেন্ড এবং বিশ্বকাপ ঘিরে জনমত বিশ্লেষণ করলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম কারণ আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক সাফল্য। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ শিরোপা এবং পরবর্তী সময়েও ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্স দলটির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, ২০০২ সালে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয়ের পর ব্রাজিল আর কোনো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে পারেনি। একই সময়ে মহাদেশীয় প্রতিযোগিতাগুলোতেও দলটি প্রত্যাশিত সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি। ফলে একসময়কার একচ্ছত্র জনপ্রিয় ব্রাজিলের সমর্থকগোষ্ঠী এখনো শক্তিশালী থাকলেও আর্জেন্টিনা তাদের ব্যবধান অনেকটাই কমিয়ে এনেছে বলে মনে করা হয়।
তবে নির্ভরযোগ্য জরিপ ছাড়া বাংলাদেশে ঠিক কোন দলের সমর্থক বেশি, সে প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া এখনো সম্ভব নয়। এক বিষয় অবশ্য নিশ্চিত—ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের উন্মাদনা অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেও ছাপিয়ে যায়।

