পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে পরাজয় স্বীকার করেননি। বরং তার অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় বিজেপি অন্তত একশটি আসন অন্যায্যভাবে নিজেদের দখলে নিয়েছে। জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকেলে কলকাতার কালীঘাটে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি ও অভিষেক ব্যানার্জী এই নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেবেন।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বিপুলসংখ্যক ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিয়ে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাকে সুষ্ঠু বলা যায় না। তবে এই অভিযোগ সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো- দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন পেয়ে বিজেপি প্রথমবারের মতো রাজ্যে সরকার গঠনের পথে।
দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের এই বড় ধরনের পরাজয়ের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। প্রধান পাঁচটি কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:
(১) নারী ভোটে ভাটা
এতদিন নারী ভোটারদের বড় অংশ তৃণমূলের পাশে থাকলেও এবার সেই সমর্থনে ফাটল দেখা গেছে। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’ বা ‘সবুজ সাথী’র মতো প্রকল্প সত্ত্বেও নারী নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের ব্যর্থতা ভোটে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে কলকাতায় এক চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গড়ে ওঠা আন্দোলন জনমনে গভীর প্রভাব ফেলে। এমনকি তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতেও বিরোধী প্রার্থীর জয় সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
(২) ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব
নিবিড় সংশোধনের ফলে প্রায় ৯০ লাখ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, যা তৃণমূলের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এতে ভুয়া বা মৃত ভোটারও বাদ গেছে, তবু এই প্রক্রিয়ায় তুলনামূলকভাবে বিজেপি সুবিধা পেয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
(৩) দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা
দীর্ঘদিনের শাসনে দুর্নীতি, কাটমানি, সিন্ডিকেট সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার অভিযোগ তৃণমূলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থতা এবং যুবসমাজের হতাশা ভোটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নির্বাচনের আগে ভাতা ঘোষণা করেও সেই ক্ষোভ প্রশমিত করা সম্ভব হয়নি।
(৪) ধর্মীয় মেরূকরণ
রাজ্যের মুসলিম ভোট দীর্ঘদিন তৃণমূলের পক্ষে থাকলেও এবার হিন্দু ভোটের একত্রীকরণ লক্ষ্য করা গেছে, যা বিজেপির পক্ষে গেছে। এমনকি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাতেও বিজেপির সাফল্য এই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, ‘সফট হিন্দুত্ব’ কৌশল গ্রহণ করেও তৃণমূল কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি।
(৫) প্রশাসনিক সুবিধার অভাব
নির্বাচন ঘোষণার পর প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের হাতে চলে যাওয়ায় শাসক দল হিসেবে তৃণমূল পূর্বের মতো সুবিধা পায়নি। বিপুলসংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনীর মোতায়েন ভোটকে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ করেছে এবং ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছেন। অনেকের মতে, এই পরিস্থিতিও তৃণমূলের বিপক্ষে গেছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

