ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

হরমুজের তলদেশে নতুন শক্তির সন্ধান পেয়েছে ইরান

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মে ১৭, ২০২৬, ০৯:৩৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান আরও শক্ত করতে এবার সমুদ্রগর্ভস্থ ইন্টারনেট ক্যাবলের দিকে নজর দিয়েছে ইরান। পারস্য উপসাগরের নিচ দিয়ে বিস্তৃত এই সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্ক ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট ডেটা ও আর্থিক তথ্য আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

তেহরান এখন এই গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিচ্ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, ইরানের জলসীমা অতিক্রম করা ক্যাবল ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ফি আদায়ের বিষয়টি বিবেচনা করছে দেশটি।

ইরানের পার্লামেন্টে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানা গেছে। রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, নির্ধারিত শর্ত মানা না হলে সংশ্লিষ্ট ক্যাবলের ইন্টারনেট ট্রাফিকে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এ নিয়ে দেশটির সামরিক মহলও সরব হয়েছে। ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ক্যাবল ব্যবহারে ফি আরোপের ইঙ্গিত দেন।

আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা ও আমাজনের মতো বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইরানের নতুন নীতিমালা অনুসরণ করতে হতে পারে। এছাড়া সাবমেরিন ক্যাবল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স ফি প্রদান এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজ স্থানীয় ইরানি কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালনার শর্তও দেওয়া হতে পারে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে পশ্চিমা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে সরাসরি ইরানকে অর্থ প্রদান করা প্রায় অসম্ভব। তাই অনেকে এই ঘোষণাকে বাস্তব পদক্ষেপের চেয়ে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেই দেখছেন।

তারপরও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। কারণ, সাবমেরিন ক্যাবলই বর্তমানে বিশ্বের ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এসব ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু ইন্টারনেট নয়, ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক, ক্লাউড সেবা, সামরিক যোগাযোগ, অনলাইন ব্যবসা ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক দিনা এসফান্দিয়ারির মতে, যুদ্ধ বা সংঘাতের পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রতিপক্ষকে চাপের মুখে ফেলতেই ইরান এমন কৌশল নিচ্ছে। এর মাধ্যমে তেহরান বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন ঝুঁকি তৈরি করতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সবাই বহুবার ভাবতে বাধ্য হয়।

নিরাপত্তাজনিত কারণে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক অপারেটর সাধারণত ওমানের জলসীমা ব্যবহার করলেও ‘ফ্যালকন’ ও ‘গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল (জিবিআই)’ নামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল ইরানের নিয়ন্ত্রিত জলসীমার ভেতর দিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ইরানের নৌবাহিনী বা বিশেষ ডুবুরি ইউনিট এসব ক্যাবলের ওপর হামলা চালালে তা বৈশ্বিক ডিজিটাল ব্যবস্থায় বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে।

এর প্রভাব পড়তে পারে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানিতে। পাশাপাশি ভারতের আউটসোর্সিং খাত, সিঙ্গাপুরের ডেটা হাব এবং ইউরোপ-এশিয়ার আর্থিক লেনদেনেও বড় ধরনের ধীরগতি দেখা দিতে পারে।

ইরান অবশ্য নিজেদের অবস্থানকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বৈধ বলে দাবি করছে। দেশটি বলছে, যেমন মিশর সুয়েজ খাল ব্যবহার করে ট্রানজিট ফি আদায় করে, তেমনি তারাও নিজেদের জলসীমা ব্যবহারকারী ক্যাবলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার রাখে। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, সুয়েজ একটি কৃত্রিম খাল হলেও হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক নৌপথ, ফলে দুই ক্ষেত্রের আইনগত কাঠামো এক নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ক্যাবল স্থাপনের ক্ষেত্রে কোনো দেশ তার নিজস্ব জলসীমায় শর্ত আরোপ করতে পারলেও বিদ্যমান অবকাঠামোর ক্ষেত্রে আগের আন্তর্জাতিক চুক্তি মানতেই হবে। সব মিলিয়ে, হরমুজকে ঘিরে ইরানের এই নতুন অবস্থান শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক ডিজিটাল ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।