ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মানুষ শিকারের প্রমোদ ভ্রমণ স্নাইপার ট্যুরিজম কী, জড়িত কারা

বিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ০১:১১ পিএম
প্রতীকী ছবি।

চাঞ্চল্যকর ‘স্নাইপার ট্যুরিজম’ এ জড়িত থাকার অভিযোগে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে ইতালির প্রসিকিউশন। ৮০ বছর বয়সি এ ব্যক্তি পেশায় ছিলেন একজন ট্রাকচালক। উত্তর ইতালির পরদেনান শহরের কাছে বসবাস করেন তিনি।   

স্নাইপার ট্যুরিজম কী?

নব্বইয়ের দশকে (১৯৯২-৯৫) বসনিয়া যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে সারায়েভোতে এক নৃশংস কর্মকাণ্ডের নাম স্নাইপার ট্যুরিজম। জানা গেছে, সে সময় অর্থের বিনিময়ে ‘মানব শিকার’র সুযোগ কিনতেন ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা। সার্ব বাহিনীকে অর্থ দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রিত পাহাড়ি এলাকা থেকে শহরের নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষদের ওপর গুলি চালাতেন তারা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শিকার করা মানুষটি পুরুষ, নারী না শিশু—তার ওপর ভিত্তি করে অর্থের পরিমাণও ভিন্ন হতো।

উল্লেখ্য, ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত চার বছরব্যাপী সার্ব বাহিনীর অবরোধে সারায়েভোতে ১১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন, যাদের একটি বড় অংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক।

যেভাবে সামনে এলো পুরোনো অভিযোগ :

‘স্নাইপার সাফারি’ কিন্তু নতুন কোনো বিষয় নয়। তিন দশক আগে ইতালির পত্রিকা ‘কোরিয়েরে দেলা সেরা’ এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও শক্ত প্রমাণের অভাবে তা বেশিদূর এগোয়নি।

‘স্নাইপার সাফারি’ নামে পরিচিত এই পাশবিক কর্মকাণ্ডের তদন্তের নেপথ্যে রয়েছেন ইতালীয় সাংবাদিক ও লেখক এজিও গাভাজ্জেনি। তিনিই প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, ‘অস্ত্রপ্রেমী ধনী ব্যক্তিরা’ সার্ব বাহিনীকে বিপুল অর্থ দিয়ে সারায়েভোর সাধারণ মানুষদের শিকারের এই সুযোগ কিনতেন। 

তবে ২০২২ সালে স্লোভেনীয় পরিচালক মিরান জুপানিচের তথ্যচিত্র ‘সারায়েভো সাফারি’ গাভাজ্জেনিকে নতুন করে অনুসন্ধানে উৎসাহিত করে। ওই তথ্যচিত্রে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের এই মানব শিকারে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলা হয়।

এরপর গাভাজ্জেনি দীর্ঘ অনুসন্ধান চালান। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি প্রায় ১৭ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রসিকিউটরদের কাছে জমা দেন, যেখানে বসনিয়ার সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাক্ষ্য এবং সারায়েভোর সাবেক মেয়র বেনজামিনা কারিচের বিবরণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গাভাজ্জেনির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইতালির সন্ত্রাসবিরোধী প্রসিকিউটর আলেসান্দ্রো গোবিস এখন বিষয়টি যাচাই করছেন।

ইতালির ‘লা রেপুবলিকা’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গাভাজ্জেনি জানিয়েছেন, এই কর্মকাণ্ডে শতাধিক ব্যক্তি অংশ নিয়েছিলেন, ইতালীয় নাগরিকেরা এর জন্য আজকের হিসাবে প্রায় ১ লাখ ইউরো পর্যন্ত খরচ করেছেন।

গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা

গাভাজ্জেনির প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বসনীয় সেনা কর্মকর্তার দাবি, ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে তারা এই ‘স্নাইপার সাফারি’র বিষয়ে জানতে পারেন এবং পরের বছর ইতালির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা সিসমি-কে বিষয়টি অবহিত করেন।

দুই মাস পর সিসমির পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়, ‘সাফারি পর্যটকরা’ ইতালির ত্রিয়েস্তে শহর থেকে উড়োজাহাজে করে সারায়েভোর উপকণ্ঠের পাহাড়ে আসত। তবে সিসমি তাদের আশ্বস্ত করে বলে, ‘আমরা এর ইতি টেনেছি, আর কোনো সাফারি হবে না।’ এর কয়েক মাসের মধ্যেই এই ‘পর্যটন’ বন্ধ হয়ে যায় বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা।

তবে এই অভিযোগ নিয়ে তীব্র সন্দেহও রয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে সারায়েভোতে দায়িত্ব পালন করা ব্রিটিশ সেনারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা বসনিয়া যুদ্ধের সময় ‘স্নাইপার পর্যটন’ বিষয়ে কখনোই কিছু শোনেননি।

তাদের মতে, পুরো সারায়েভো শহর অসংখ্য চেকপোস্ট দিয়ে ঘেরা ছিল। এই পরিস্থিতিতে তৃতীয় কোনো দেশ থেকে কাউকে শুধু বেসামরিক মানুষ মারার জন্য সার্ব বাহিনীর অবস্থানে নিয়ে আসা ‘অত্যন্ত কঠিন’ একটি ব্যাপার। একজন ব্রিটিশ সেনা এই অভিযোগকে ‘শহুরে কল্পকাহিনি’ বলেও অভিহিত করেছেন।

যদিও রুশ লেখক ও রাজনীতিবিদ এডুইয়ার্ড লিমোনভের একটি ঘটনা এই অভিযোগের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। ১৯৯২ সালে তাকে সার্ব নেতা ও পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত রাদোভান কারাজিচের সঙ্গে সারায়েভোর পাহাড়ে একটি হেভি মেশিনগান থেকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। তবে তিনি এর জন্য কোনো অর্থ দেননি, বরং কারাজিচের প্রতি মুগ্ধতা থেকেই সেখানে গিয়েছিলেন।