ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ইব্রাহিমি মসজিদ কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

মিডল ইস্ট আই
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম
ইব্রাহিমি মসজিদ। ছবি : সংগৃহীত

পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের পুরাতন অংশে অবস্থিত ইব্রাহিমি মসজিদ। এটি- ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিস্টধর্ম- এই তিনটি আব্রাহামিক ধর্মের অন্যতম পবিত্র স্থান। প্রায় ১ হাজার ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিরা এ মসজিদের তত্ত্বাবধান করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল এই স্থানটির উপর বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

ইব্রাহিমি মসজিদ একটি প্রাচীন গুহা-ব্যবস্থার উপর নির্মিত, যেখানে প্রায় ২ হাজার বছরের পুরোনো সমাধি কমপ্লেক্স রয়েছে।

ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কাছে এটি ‘পিতৃপুরুষদের গুহা’ (Cave of the Patriarchs) নামে পরিচিত এবং তালমুদ ও পুরাতন নিয়মে ‘মাখপেলাহের গুহা’ হিসেবে উল্লেখ আছে।

মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এখানে নবী ইব্রাহিম (আ.) ও তার পরিবারের সদস্যদের সমাধি রয়েছে। বর্তমান কাঠামোর বড় অংশ দ্বাদশ শতাব্দীতে ক্রুসেডারদের নির্মিত একটি রোমানেস্ক গির্জা, যা পরে মুসলিম আইয়ুবি শাসকেরা পুনরায় মসজিদে রূপান্তর করেন। মামলুক ও অটোমান আমলেও এটি মুসলিম তত্ত্বাবধানে ছিল।

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করে এবং মসজিদে ইহুদিদের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি পায়। ২০১৭ সালে ইউনেস্কো হেবরনের পুরাতন শহরকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অন্তর্গত বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সংস্থা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।

১৯৯৪ সালে কিরিয়াত আরবার বসতি স্থাপনকারী বারুচ গোল্ডস্টেইন রমজান মাসে মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর গুলি চালিয়ে ২৯ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেন এবং আরও অনেকে আহত হন।

এ ঘটনার পর মসজিদটি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়- দুই-তৃতীয়াংশ ইহুদিদের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ মুসলমানদের জন্য। নির্দিষ্ট ধর্মীয় দিবসে এক পক্ষের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে। মসজিদটি হেবরনের এইচ-২ এলাকায় অবস্থিত, যা ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিম তীরের বিভিন্ন পবিত্র স্থানের মতো ইব্রাহিমি মসজিদেও প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আজানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ, বসতি স্থাপনকারীদের ঘন ঘন প্রবেশ এবং প্রাঙ্গণে বিভিন্ন আয়োজনের অভিযোগ উঠেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েল মসজিদের ফিলিস্তিনি পরিচালকদের সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে এবং কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণের পৌর নিয়ন্ত্রণ হেবরন পৌরসভার কাছ থেকে কেড়ে নেয়, ফলে পরিকল্পনা ও নির্মাণের অধিকার তাদের হাতে চলে যায়।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপকে পশ্চিম তীরে ‘ইহুদিকরণ প্রকল্পের’ অংশ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। হামাস বলেছে, এটি হেবরনের আরব ও ইসলামী পরিচয় ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টা। অন্যদিকে ইসরায়েলি বেসামরিক প্রশাসন দাবি করেছে, এই পদক্ষেপ স্থিতাবস্থা বজায় রাখবে এবং প্রার্থনার ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলবে না।

মসজিদের পরিকল্পনার অধিকার দখলের ঘোষণার পর কাতার, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানায়।

ফিলিস্তিনি আইনজীবীরা ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন এবং ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তকে আইনি ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পুরো পরিস্থিতি এখনো অমীমাংসিত, এবং এটি ধর্মীয় অধিকার, ঐতিহাসিক দাবি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের জটিল সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।