বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি এখন যুদ্ধের ছায়ায় আবদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরু করার পর এই সংকীর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে গেছে। এমন অবস্থায় ভাবা হচ্ছিল, জাহাজের চলাচল বন্ধ বা প্রায় শূন্যে নেমে গেছে।
তবে বিবিসি ভেরিফাই-এর বিশেষ বিশ্লেষণ একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। মার্চ মাসের প্রথম ১৯ দিনে প্রায় ১০০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে দৈনিক গড়ে ১৩৮টি জাহাজ চলাচল করত, কিন্তু শিপিং অ্যানালিস্ট প্রতিষ্ঠান কেপলার জানাচ্ছে, এখন দৈনিক মাত্র ৫–৬টি জাহাজই এই সংকীর্ণ (৩৮ কিলোমিটার প্রশস্ত) জলপথ ব্যবহার করছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রণালি পারাপারকারী জাহাজগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইরানের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ১৪টি জাহাজ সরাসরি ইরানের পতাকাবাহী, বাকিগুলো ইরানের তেল বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায়। এছাড়া ৯টি জাহাজ চীনের মালিকানাধীন এবং ৬টি ভারতের গন্তব্যে যাচ্ছিল। বিস্ময়ের বিষয়, ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন কিছু গ্রিক মালিকানাধীন জাহাজকেও ইরানের বন্দরে নোঙর করতে দেখা গেছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি পারাপারকারী জাহাজগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৫ মার্চ পাকিস্তানের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজ আন্তর্জাতিক নৌপথ এড়িয়ে ইরানের উপকূল ঘেঁষে চলেছে। মার্কিন থিংকট্যাংক র্যান্ড করপোরেশনের গবেষক ব্র্যাডলি মার্টিন মনে করেন, ‘জাহাজটি সম্ভবত ইরানের নির্দেশনা অনুযায়ী চলেছে’।
শিপিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান মূলত হামলা ও মাইন স্থাপনের ভয় দেখিয়ে জাহাজগুলোকে তাদের জলসীমায় প্রবেশ করাচ্ছে। উইন্ডওয়ার্ড মেরিটাইম অ্যানালিটিক্সের মিশেল উইস বকম্যান বলেন, ‘ইরান এখন ভয় দেখিয়ে প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক চ্যানেল ব্যবহার না করে ইরানের উপকূল ঘেঁষে চলতে বাধ্য হচ্ছে।’
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ১১ মার্চ থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘ময়ূরী নারী’ জাহাজে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, যার ফলে ২৩ জন ক্রুর মধ্যে ৩ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন।
একই দিনে গ্রিক মালিকানাধীন ‘স্টার গুইনেথ’ ও মার্কিন মালিকানাধীন ‘এমটি সেফসি বিষ্ণু’ জাহাজেও হামলা চালানো হয়; এক ক্রু প্রাণ হারায় এবং ২৮ জন সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য হন। মালিক এস ভি আঞ্চান বিবিসিকে বলেন, “বাণিজ্যিক নৌপথ কোনো যুদ্ধক্ষেত্র হতে পারে না। এই কর্মীরাই বিশ্ব বাণিজ্য সচল রাখেন।”
বিবিসি ভেরিফাই জানাচ্ছে, এই জাহাজগুলোর অধিকাংশই অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (AIS) বন্ধ রেখে প্রণালি অতিক্রম করছে। কেপলার-এর বিশ্লেষক দিমিত্রি আম্পাতজিদিস বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক জাহাজ এখন চোখ বন্ধ করে বা রাডার অফ করে চলাচল করছে।’ হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের সময় তারা কিছু সময়ের জন্য ম্যাপ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে এবং পরে অন্যত্র পুনরায় দেখা যাচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুতগামী আক্রমণকারী বোট এবং মাইনসহ এই বহুস্তরীয় হুমকি মোকাবিলা করা কঠিন। হরমুজ প্রণালির সরু ও অগভীর প্রকৃতি এবং পাহাড়ঘেরা উপকূলের কারণে ইরান সহজেই ওপর থেকে আক্রমণ চালাতে সক্ষম। তাই যারা এই অস্থির সময়ে প্রণালি পার হচ্ছে, তারা হয়তো ইরানের নির্দেশনা বা আনুকূল্য অনুযায়ী এটি করছে।



