মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধে উত্তেজনা তুঙ্গে থাকার মধ্যেই অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন করে সহিংসতার আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। একের পর এক ফিলিস্তিনি গ্রামে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি, যানবাহন ও ফসলি জমিতে অগ্নিসংযোগ করছে উগ্রপন্থি ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা। এতে পুরো অঞ্চলে চরম আতঙ্ক ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
গত শনিবার (২১ মার্চ) ১৮ বছর বয়সি ইহুদি তরুণ ইহুদা শেরম্যানের মৃত্যুর পর এই সহিংসতা শুরু হয়। কোয়াড বাইক চালানোর সময় এক ফিলিস্তিনির গাড়ির ধাক্কায় তার মৃত্যু হয়। পুলিশ এখনো নিশ্চিত করতে পারছে না এটি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত। তবে ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বসতি স্থাপনকারীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান ছড়িয়ে পড়ে।
পরের রাতেই জালুদ, কারিয়ুত, আল-ফান্দুকুমিয়াহ এবং সিলাত আদ-দাহরসহ একাধিক ফিলিস্তিনি গ্রামে হামলার ঘটনা ঘটে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, মুখোশধারী ৯০-এর বেশি হামলাকারী গ্রামে ঢুকে দৌড়াচ্ছে। একাধিক যানবাহনে আগুন লাগানো হয়েছে, ভবনের জানালা ভেঙে ফেলা হয়েছে, এবং দেয়ালে লেখা হয়েছে ‘ইহুদার বদলা নাও’। জালুদ গ্রামে হামলার সময় অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি মাথায় আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এক রাতেই ২০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা ১৮ জন। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সহিংসতার মাত্রা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েলি সেনা ও সীমান্ত পুলিশ বিভিন্ন গ্রামে মোতায়েন হয়েছে। দেইর আল-হাতাব গ্রামের কাছ থেকে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, আগাম সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও হামলা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাগুলোকে ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাস এবং ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি পুড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি’ বলে বর্ণনা করেছে। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘ইয়েশ দিন’ এটিকে ‘এক রাতের তাণ্ডব বা পোগ্রোম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এমনকি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকেও এই সহিংসতাকে নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ১৬০টি ইহুদি বসতি গড়ে উঠেছে, যেখানে বর্তমানে প্রায় সাত লাখ ইসরায়েলি বসবাস করছেন। অন্যদিকে প্রায় ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনি এই ভূখণ্ডকে তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব বসতি অবৈধ, তবে বাস্তবে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল ও সহিংস হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের মধ্যেই পশ্চিম তীরে এই সহিংসতা আরও বাড়ছে। প্রতিশোধের রাজনীতি, নিরাপত্তাহীনতা এবং বসতি স্থাপনকারীদের উগ্র কর্মকাণ্ডে সাধারণ ফিলিস্তিনি জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিদিন তারা আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা এবং সহিংসতার মধ্যে জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা



