ইসরায়েলি হামলায় গাজায় নিহত সাংবাদিকের চিঠি পড়ে জাতিসংঘে আবেগে ভেঙে পড়লেন আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আমর বেনজামা। চিঠিটা ছিলো ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মরিয়ম আবু দাগ্গার, যিনি এই সপ্তাহের শুরুতে গাজার নাসের হাসপাতালে ইসরায়েলি হামলায় নিহত পাঁচ সাংবাদিকের একজন। ওই হামলায় আরও ২০ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। চিঠিটা তিনি মৃত্যুর আগেই ছেলে গাইথের উদ্দেশে লিখেছিলেন । বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে এ খবর দিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি।
মৃত্যুর কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ১৩ বছর বয়সি ছেলেকে উদ্দেশ করে আবু দাগ্গা লিখেছিলেন, ‘তুমি তোমার মায়ের প্রাণ আর আত্মা… আমি মারা গেলে আমার জন্য কেঁদো না, দোয়া করো। আর তুমি বড় হলে, বিয়ে করলে, আর কন্যাসন্তান জন্মালে—তার নাম রেখো মরিয়ম, আমার নামে।’
বেনজামা বলেন, মরিয়মের এই বিদায়বার্তাই ‘যে কোনো সরকারি বিবৃতির চেয়ে বেশি সত্য বহন করে’। ক্ষোভ প্রকাশ করে বেনজামা বলেন, আবু দাগ্গার হাতে ছিল কেবল একটি ক্যামেরা, আর শরীরে কেবল প্রেস ভেস্ট। সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করে গাজার সত্য লুকিয়ে রাখতেই ইসরাইল এভাবে হত্যা চালাচ্ছে।
জাতিসংঘে আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ২৪৫ সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। গত আগস্টের শেষ দিকে আরও ছয়জনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করেছে আইডিএফ। তারা সঙ্গে রাখে কেবল শব্দ, ছবি আর কণ্ঠস্বর—কিন্তু এই পরিষদ এই নৃশংসতার পরও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’
ভাষণে তিনি ২ বছরের ক্ষুধার্ত শিশু ইয়াজান আবু ফুলের ঘটনাও তুলে ধরেন—যাকে অস্থি-চর্মসার অবস্থায় বাবার কোলে দেখা গিয়েছিল। বেনজামা বলেন, ‘একটি শিশুকে এভাবে ধুঁকে যেতে দেখা গাজার বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।’ ভাষণে তিনি গাজাকে ‘জীবন্ত নরক’ আখ্যা দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদকে সমালোচনা করেন—যা তার মতে ‘শোক প্রকাশের থিয়েটারে’ পরিণত হয়েছে। তিনি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি চাপিয়ে দেওয়া, ব্যাপক মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ‘গণহত্যা থামানোর’আহ্বান জানান।
এদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ ও ত্রাণকর্মীরা সতর্ক করেন, গাজা জুড়ে দুর্ভিক্ষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এ সময় ১৪ সদস্য ‘ক্ষুধাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের’ তীব্র নিন্দা জানিয়ে ‘অবিলম্বে, নিঃশর্ত ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি’র আহ্বান জানান। এছাড়া তারা সব বন্দির মুক্তি এবং ত্রাণ সহায়তা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কথা বলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ওই ঘোষণায় সই করতে অস্বীকৃতি জানায়।
ইসরায়েলি আগ্রাসনে ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া উপত্যকায় দুর্ভিক্ষ চরম আকার ধারণ করেছে। গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োযভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এছাড়া ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও (আইসিজে) মামলা চলছে।