× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ, কলাম লেখক ও প্রবন্ধকার

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৪, ২০২৫, ০২:১৭ এএম

গণমাধ্যমের দরজায় আগুন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দগ্ধ

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ, কলাম লেখক ও প্রবন্ধকার

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৪, ২০২৫, ০২:১৭ এএম

গণমাধ্যমের দরজায় আগুন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দগ্ধ

একটি সমাজের গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী, তা বোঝা যায় তার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা নিরাপদ। তথ্যের স্বচ্ছ প্রবাহ, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ না থাকলে সমাজ ক্রমেই ভয়, গুজব ও ধোঁয়াশার কবলে পড়ে। বাংলাদেশে আজ সাংবাদিকতা এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সংবাদ প্রকাশের জন্য যারা মাঠে বের হন, তারা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কাজ করছেন। অফিসে প্রবেশ বা বের হওয়াই কখনো কখনো বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলার ঘটনা সেই বাস্তবতার স্পষ্ট প্রমাণ।

হামলার শিকার পত্রিকাগুলো

বাংলাদেশে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক হামলার ইতিহাস রয়েছে। কিছু উল্লেখযোগ্য পত্রিকা হলেÑ দৈনিক আমার দেশ : অফিসে অভিযান, যন্ত্রপাতি জব্দ ও প্রকাশনা বন্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

দৈনিক সংগ্রাম : বিভিন্ন সময়ে অফিসে হামলা ও প্রকাশনায় বাধার মুখে পড়েছে।

দৈনিক নয়াদিগন্ত : বিক্ষোভ, হুমকি ও চাপের কারণে সংবাদ প্রকাশে বাধার সম্মুখীন।

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার : সম্প্রতি কার্যালয়ে হামলার শিকার। পত্রিকার অবস্থান বা আদর্শ ভিন্ন হলেও বার্তাটি এক ভিন্ন কণ্ঠকে সহ্য করার মানসিকতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

ফরিদুল মোস্তফা খানের করুণ বাস্তবতা

কক্সবাজারের সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খান দেশের সাংবাদিক সমাজের জন্য দগ্ধ উদাহরণ। মেজর সিনহা হত্যা মামলায় ফাঁসির দ-প্রাপ্ত বহিষ্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাসের হাতে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নজরে এই ঘটনা এসেছে, তবে বিচারিক প্রক্রিয়া অগ্রসর হয়নি। খানের পরিবার দীর্ঘদিন মানবেতর জীবনযাপন করছে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মামলার খরচ চালাতে গিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। রাষ্ট্র বা সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের সহায়তা কার্যকর হয়নি। মামলার নিষ্পত্তি, জানমালের নিরাপত্তা বা আটকে রাখা পাসপোর্ট উদ্ধারের ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। জামিনে মুক্তির পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে করা আবেদনগুলো রহস্যজনকভাবে ঝুলে আছে। প্রমাণ হিসেবে রয়ে গেছে কেবল আবেদনের রিসিভ কপি। ফরিদুল মোস্তফা খানের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত কষ্ট নয়; এটি সাংবাদিকদের জন্য একটি শক্তিশালী সংকেত। যারা সাহস করে অনুসন্ধানী রিপোর্টিং করেন, তারা রাষ্ট্রীয় অবহেলা, হুমকি ও বিচারহীনতার শিকার হতে পারেন। এটি সাংবাদিক সমাজে ভয় ও নীরবতা তৈরির একটি বার্তা। সাংবাদিকরা যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন, সেই পরিবেশের জন্য দায়ী রাষ্ট্রের উপস্থিতি জরুরি। কিন্তু অবহেলা থাকায় সাংবাদিকদের মানসিক ও পেশাগত নিরাপত্তা ক্রমেই হুমকির মুখে।

অন্যান্য সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব

সাগর-রুনি হত্যাকা-ও এই বাস্তবতার অংশ। সাংবাদিক দম্পতি দীর্ঘদিন ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। মামলাটি আজও সমাধান হয়নি, যা বিচারহীনতার স্থায়ী প্রতীক। মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের ওপরও হুমকি, মিথ্যা মামলা এবং পেশাগত চাপ বাড়ছে। অনেকে প্রকাশ্যে আসতে না পেরে নীরবে পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।

গণমাধ্যমে হামলা মানে শুধু অফিস বা ছাপাখানায় আগুন দেওয়া নয়। এটি আঘাত করে সমাজের জানার অধিকারকে। আতঙ্কের মধ্যে কাজ করা সাংবাদিকের পক্ষে স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান করা বা ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সমাজ পায় খ-িত সত্য বা নীরবতা, যা শেষ পর্যন্ত সমাজকে দুর্বল করে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলোÑ এগুলো সমাজে স্বাভাবিক হয়ে ওঠার ধারা তৈরি করছে। গণমাধ্যমে হামলা যেন ‘নিয়মিত খবর’। কয়েকদিন আলোচনা হয়, বিবৃতি আসে, তারপর সব আগের মতো চলতে থাকে। সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে গেলে তা আরও বিস্তৃত ও নির্মম রূপ নেয়।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। রাষ্ট্র যদি এখানে নিরপেক্ষ দর্শক হয়, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি জরুরি হলেও তা যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হলোÑ হামলাকারীরা কী পরিণতি ভোগ করছে? তদন্ত কতটা স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান? বিচার হচ্ছে কি না? স্পষ্ট উত্তর না থাকলে হামলার সাহস আরও বাড়বে।

সাংবাদিক সমাজের মধ্যেও সংহতি জরুরি। দলীয় বিভাজন বা আদর্শিক দূরত্বের কারণে একে অপরের বিপদে নীরব থাকলে ক্ষতি সবার। আজ যে পত্রিকায় হামলা হচ্ছে, কাল সেটি অন্য কোনো কণ্ঠের দিকেও ফিরে যেতে পারে। পেশাগত সংহতি গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবেÑ গণমাধ্যম দুর্বল হলে শক্তিশালী হয় কেবল গুজব ও ভয়। সংবাদপত্রের নিরাপত্তা মানে মালিক বা সম্পাদক নয়; এটি নাগরিকের জানার অধিকার। প্রশ্ন করার সুযোগ হারালে মানুষ ধীরে ধীরে অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, আর সেই অন্ধকারেই জন্ম নেয় স্বৈরাচার।

পরিশেষে বলতে চাই, আজ স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজনÑ সংবাদপত্রে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংগ্রাম, নয়াদিগন্ত, আমার দেশ, প্রথম আলো কিংবা ডেইলি স্টারÑ নাম নয়, নীতিই আসল। মতভেদ থাকবে, বিতর্ক থাকবে। কিন্তু সেই বিতর্ক হবে কলাম, যুক্তি ও আলোচনা দ্বারাÑ আগুন বা হুমকির মাধ্যমে নয়।

ফরিদুল মোস্তফা খানের মতো নির্যাতিত সাংবাদিকরা আমাদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছেন। তাদের অবহেলা সমাজের জন্য বিপজ্জনক। গণমাধ্যমের দরজায় আগুন লাগলে পুড়ে যায় শুধু একটি অফিস নয়, পুড়ে যায় সমাজের বিবেক। সেই বিবেক রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সাংবাদিক সমাজ এবং নাগরিকÑ সবার। যে সমাজ সাংবাদিকদের নিরাপদে কাজ করার পরিবেশ দিতে ব্যর্থ, সে সমাজই ভিন্নমত, অনুসন্ধান ও সত্য জানার অধিকার হারাবে। গণমাধ্যমের নিরাপত্তা মানে শুধু সাংবাদিকদের রক্ষা নয়; এটি গণতন্ত্রের রক্ষা। আজ আমরা যদি নীরব থাকি, তবে কালকে সেই নীরবতাই সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে। তাই সব পক্ষকে সচেতন, সংহত এবং দায়শীল হতে হবে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!