প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য নারীকে ইতালিতে পাঠানোর অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার ও ভিসা জালিয়াতি চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযানে তাদের কাছ থেকে ৫৬টি পাসপোর্ট, ১৫৩টি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সিল, একটি এম্বোস সিল, তিনটি সিপিইউ, একটি ল্যাপটপ এবং নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।
সিআইডি জানায়, গত ২০ জুলাই রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় অভিযান চালিয়ে মানবপাচার শাখার (টিএইচবি) সদস্যরা তাদের গ্রেপ্তার করেন। এ ঘটনায় গুলশান থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬ এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—মো. বেলায়েত হোসেন (৪০), নাজমুল হাসান (১৯), মেহেদী হাসান (৩৭), মো. সোলাইমান সুমন (৩২), ফজলে রাব্বী (২৭), মো. তৌহিদুর রহমান (২৪) এবং কাওসার হোসেন (৪২)।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ভুক্তভোগী এক নারীর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে ইতালিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ইতালির দূতাবাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। পরে দূতাবাসে পাসপোর্ট নবায়নের সময় অভিযুক্ত নাজমুল হাসানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। নাজমুল নিজেকে ভিসা ও পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজের দক্ষ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে গুলশানের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে নিয়ে যান, যেখানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হিসেবে বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
অভিযুক্তরা ইতালির ভিসা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ওই নারীর সঙ্গে আর্থিক চুক্তি করেন। পরে বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে মোট ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। টাকা নেওয়ার পর পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হলেও, পরবর্তীতে ইতালিগামী বিমানের ফ্লাইটে ইমিগ্রেশন করতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তার পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসা ব্যবহার করে এরই মধ্যে অন্য এক নারী ইতালিতে চলে গেছেন।
এ ঘটনায় তিনি সিআইডির মানবপাচার শাখায় অভিযোগ করলে তদন্ত শুরু হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে চক্রটির সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক তদন্তে সিআইডি জানতে পেরেছে, চক্রটি বিদেশে যাওয়ার আগ্রহী ব্যক্তিদের ইতালির ভিসা ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিত। পরে কৌশলে তাদের পাসপোর্ট নিজেদের কাছে রেখে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানো হতো।
সিআইডির দাবি, জব্দ হওয়া ৫৬টি পাসপোর্ট ও ১৫৩টি বিভিন্ন ধরনের সিল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ভিসা জালিয়াতি ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত।
তদন্তে আরও জানা গেছে, চক্রটির মূলহোতা বেলায়েত হোসেন ২০১৬ সাল থেকে একই কৌশলে প্রায় ৩০ জনকে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এছাড়া একই ধরনের অপরাধে দায়ের হওয়া ২০২৪ সালের একটি মামলায় তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
সিআইডি জানিয়েছে, জব্দ করা পাসপোর্ট, সিল, কম্পিউটারসহ অন্যান্য আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে। পাশাপাশি অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেন, দেশি-বিদেশি সহযোগী এবং সম্ভাব্য অন্যান্য ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া অর্থ বা পাসপোর্ট হস্তান্তর না করার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। একই সঙ্গে ভিসা জালিয়াতি, মানবপাচার বা অবৈধ অভিবাসন সংক্রান্ত কোনো সন্দেহজনক কার্যক্রম সম্পর্কে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে নাগরিকদের অনুরোধ করা হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন