× UCB Sticker Card
বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম

আচমকা গ্যাস সংকট

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস তথা এলএনজির জন্য দেশে দুটি টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনার দায়িত্বে সামিট গ্রুপ। অন্যটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি। এ দুই টার্মিনাল এবং দেশীয় উৎস থেকে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও বর্তমানে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ একটি এলএনজি টার্মিনাল কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে গত মঙ্গলবার থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের। এতে আবাসিক থেকে শুরু করে সব খাতে বিরাজ করছে গ্যাসের তীব্র সংকট।

চুলায় গ্যাস না থাকায় খাবারের জন্য হোটেল-রেস্তোরাগুলোতে বেড়েছে ভিড়। শিল্পকারখানায় থমকে আছে উৎপাদন। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া পরিবহন খাতেও তৈরি হয়েছে বড় সংকট। মধ্যপ্রাচ্য সংকট কাটিয়ে ওঠার কয়েক দিনের মাথায় ফের গ্যাসের সংকটে বিদেশি বিনিয়োগেও বড় ধাক্কা খেতে যাচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এর অন্যতম কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত তৈরি করাকেই দুষছে সরকার। তবে কিছুদিনের মধ্যেই এই সংকট কেটে যাবে বলেও জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে আশস্ত করা হয়েছে।

টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি ও মেরামত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের টার্মিনালটিতে কয়েক দিন পরপরই দেখা দেয় কারিগরি ত্রুটি। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, এক্সিলারেট এনার্জির শিডিউল রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য প্রতি বছর দেড় মাস এবং সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আরও ১৫ দিন, মোট দুই মাস এলএনজি সরবরাহের বাইরে থাকে। এ সময় একটি টার্মিনাল দিয়ে ৫০ থেকে ৫৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যায়। তাই এ সময় দেশে গ্যাসের সংকট থাকে। কিন্তু সম্প্রতি একাধিকবার টার্মিনালটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় দেশে গ্যাসের সংকট লেগেই থাকছে। এর আগে গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় ১৫ দিন বন্ধ থাকে টার্মিনালটি। পরে ত্রুটি সারিয়ে উৎপাদনে ফিরলেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে প্রায় এক মাস লেগে যায়। 

সম্প্রতি একই সংকট তৈরি হওয়ায় আবাসিক খাতসহ প্রায় সব খাতে ইতোমধ্যে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। আবাসিক খাতের পাশাপাশি সিএনজি ফিলিং স্টেশন, শিল্প খাতেও পাওয়া যাচ্ছে না চাহিদামতো গ্যাস। ফলে সব গ্রাহককেই পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। বিষয়টি সমাধানে কোনো পক্ষ থেকে কোনো পথ না দেখালেও একে অপরের দায় চাপাচ্ছে নিয়মিত। তিতাস বলছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) থেকে চাহিদামতো গ্যাস না পাওয়ায় কমাতে হচ্ছে সরবরাহ। আর পেট্রোবাংলা বলছে, দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিও কমে গেছে। ফলে চাইলেও পাইপলাইনে চাহিদামতো বাড়ানো যাচ্ছে না গ্যাসের চাপ।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমদানিনির্ভর জ্বালানিনীতির কারণে এই সংকট দাবি করে জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। গতকাল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব ও মুনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের একটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এটি সাময়িক সমস্যা। আশা করছি দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুটি এফএসআরইউর একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সাময়িকভাবে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কিছু সিএনজি স্টেশন প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস নিতে পারছে না এবং কয়েকটি এলাকায় দীর্ঘ সারির সৃষ্টি হয়েছে। এটি সাময়িক সমস্যা। মেরামতের কাজ চলছে এবং দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এই সংকট শুধু সিএনজি স্টেশনেই সীমাবদ্ধ, জ্বালানি তেল সরবরাহ বা ফিলিং স্টেশনের কার্যক্রমে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।’

মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র জানান, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এফএসআরইউটির ত্রুটি মেরামতের কাজ করছেন। একই সঙ্গে সীমিত গ্যাস সরবরাহের মধ্যে শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতে সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি হলেও দীর্ঘদিন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোর কোনো একটি অংশে সমস্যা দেখা দিলে পুরো গ্যাস সরবরাহব্যবস্থাই চাপের মুখে পড়ে।’ এই নির্ভরতা কমাতে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি। এর অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে ১০০ গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, বুধবার একনেক সভায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ এলাকায় ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি নতুন কূপ খননের একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এ ছাড়া অনশোর ও অফশোর উভয় এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, চতুর্থ এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ, মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই, ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার ব্যবস্থা এবং নতুন কূপ খনন ও পুরোনো কূপের উৎপাদন বৃদ্ধির কাজ চলমান রয়েছে।’ 

মুনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এফএসআরইউটির কারিগরি সমস্যা সমাধান হলেই গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে সরকার আশাবাদী।’ সাময়িক এই ভোগান্তির জন্য গ্রাহকদের কাছে আন্তরিক দুঃখও প্রকাশ করেন তিনি।

দুই দিন পর পর গ্রাহকদের এমন দুর্ভোগ কেন পোহাতে হবে- এর কারণ জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘কাতার এলএনজি পাঠানো অর্ধেক করে ফেলেছে। তাদের এলএনজি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও চীন নিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে কাতার থেকে এলএনজি পাওয়াটা বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে। এগুলো নতুন নয়। তবু আমাদের শিক্ষা হয় না। আমদানির দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়। আর দুর্ভোগ পোহাতে হয় গ্রাহকদের। কমে যায় শিল্পোৎপাদন। এর থেকে বের হয়ে দেশীয় উৎপাদনে সরকারকে বেশি করে মনোনিবেশ করতে হবে। সক্ষমতা বাড়াতে হবে পেট্রোবাংলা, বাপেক্সের। তবেই এমন সংকট তৈরি হবে না।’ 

এদিকে একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকার ফলে গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার বাসাবাড়িতে গত দুই দিন যাবৎ জ¦লছে না চুলা। প্রতিদিনই তিতাসের অভিযোগ কেন্দ্রে আসছে হাজার হাজার অভিযোগ। গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাসাবো, পুরান ঢাকার বাসিন্দারা। এমনকি সংকট রয়েছে অভিজাত এলাকা বলে খ্যাত ধানমন্ডি, গুলশানেও। 

রাজধানীর গ্রিণ রোড এলাকার বাসিন্দা শারমীন সুলতানা রীনা বলেন, ‘কদিন আগে শুনলাম যুদ্ধের কারণে গ্যাস নাই। শীতের সময় শুনি পাইপের গ্যাস জমে গেছে, তাই গ্যাস নাই। এখন আবার এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকার কারণে গ্যাস নাই। সব দুর্ভোগ কি আমাদের জন্যই।’

দিনে মাত্র চার ঘণ্টা চুলায় গ্যাসের চাপ থাকছে বলে অভিযোগ করেন মিরপুর ১৪ নম্বরের বাসিন্দা নুসরাত জাহান। তিনি বলেন, ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করি। কিন্তু বাসায় ফিরে চুলায় গ্যাস না থাকায় বেশির ভাগ দিনই বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হয়।’

একই অবস্থা শিল্পাঞ্চলগুলোতেও। তবে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পোশাকশিল্পের মালিকদের। বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের বেশির ভাগ কারখানাতেই গ্যাসের চাপ পাওয়া যাচ্ছে না চাহিদামাফিক। যদি এরকমটি চলতে থাকে, তাহলে তো গার্মেন্টস মালিকদের পথে বসে যেতে হবে।’

এদিকে গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে যানবাহনগুলোকে। গাড়িচালক ও মালিকেরা বলছেন, গত মঙ্গলমবার থেকে গ্যাস না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে। রাজধানীর মগবাজারে আনুদীপ সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষারত সিএনজি অটোরিকশাচালক সোহাগ মিয়া বলেন, ‘সিরিয়াল দিয়েছি তিন ঘণ্টা আগে। এখনো গ্যাস পাইনি। গ্যাস থাকলেও প্রেশার নেই। ৬০০ টাকার গ্যাস নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি মাত্র ৩০ কিলোমিটার। এভাবে কীভাবে পোষাবে!’ 

দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সংকট চলছে। সমাধানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আমদানির জন্য নতুন বাজার খোঁজার পাশাপাশি দেশীয় কূপগুলো খননেও জোর দেওয়া হচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় আমরা পরিত্যক্ত কূপে নতুন করে অনুসন্ধানকাজ শুরু করতে যাচ্ছি।’

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!