নারীর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে শ্যামনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, দল থেকে বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না। এ বিষয়ে সংবিধান ও নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যাও সামনে আসছে।
ঘটনাটি ঘিরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে জামায়াত। বিভিন্ন মহল সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানাচ্ছেন।
বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি এক বৈঠকে গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় তাকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একই সঙ্গে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে অবহিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
যা বলছে সংবিধান ও ইসি : সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যদি ‘দল থেকে পদত্যাগ করেন’ অথবা ‘সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন’, তাহলে তার সংসদীয় আসন শূন্য হবে। তবে দল যদি কাউকে বহিষ্কার করে, সেই পরিস্থিতিতে কী হবে- এ বিষয়ে সংবিধানে কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। অন্যদিকে সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ড হলে একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতা হারাবেন। যদিও গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত আদালতের কোনো দণ্ড বা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
সংসদীয় রীতি ও সংবিধান বিশ্লেষকেরা বলছেন, আইনি কাঠামো অনুযায়ী শুধু দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার সুযোগ নেই।
এ ঘটনায় নির্বাচন কমিশনে (ইসি) কোনো নোটিশ যায়নি বলে জানা যায়। নোটিশ পেলে আইন অনুযায়ী কমিশন পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ।
যদিও ২০০৫ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য আবু হেনাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। স্থানীয় এক মন্ত্রীকে জঙ্গিদের মদতদাতা আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার পর তিনি দলীয় শাস্তির মুখে পড়েন। তখনকার স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘আবু হেনা দল থেকে পদত্যাগ করেননি এবং সংসদে দলের বিপক্ষেও ভোট দেননি। ফলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের কোনো আইনগত সুযোগ ছিল না। দল থেকে বহিষ্কার হলেও তিনি সংসদ সদস্য পদে বহাল ছিলেন।
গত সোমবার রাতে ভিডিওটি ছাড়ানোর পর প্রথমে জামায়াতের নেতাকর্মীরা এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বলে দাবি করেন। এরপর গত মঙ্গলবার সংসদ সদস্য তার ফেইসবুকে বিষয়টি নিয়ে একটি পোস্ট লিখে সেখানে ওই নারীকে দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য ছিলেন। তার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের যে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, তার কয়েকটি অংশে দেখা যায়, ওই নারীর সঙ্গে নজরুল ইসলাম একটি কক্ষে অবস্থান করছেন। কোনো অংশে আবার তাদের অন্তরঙ্গ অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন জামায়াতের এই নেতা।
এ বিষয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা দেখা যায়। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা লেখেন, ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও যা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সেটির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাই। জারা ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, সিভি অনুযায়ী ওই তরুণীর বয়স মাত্র আঠারো। এসএসসি শেষ হওয়ামাত্রই যেহেতু চাকরি খুঁজছেন, তাই অনুমান করা যায় বাড়িতে অভাব। এই রকম সংসারে একটা চাকরি মানে শুধু চাকরি না। চাকরি মানে মায়ের ওষুধ, ছোট ভাইয়ের ফিজিকস টিচারের বেতন, বৃষ্টি এলে যে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে তা সারানো। তিনি বলেন, এ দেশে গরিবের চাকরি হয় কীভাবে? পরীক্ষা দিয়ে, লাইনে দাঁড়িয়ে। আর সবশেষে, কোনো ক্ষমতাবান মানুষের দরজায় গিয়ে সুপারিশ নিয়ে। এলাকার সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষটির নাম এমপি সাহেব। তো একদিন সিভিটা এমপি সাহেবের কাছে পৌঁছাল। হয়তো মেয়েটি নিজে নিয়ে গিয়েছিল, হয়তো পরিবারের কেউ। ভরসা নিয়ে গিয়েছিল। যেভাবে গরিব মানুষ ক্ষমতাবানদের দ্বারস্থ হয়। সিভিতে সই পড়ল। জোর সুপারিশ করা হলো। কিন্তু সুপারিশের দাম হিসেবে মেয়েটিকে কী দিতে হয়েছে? হয়তো কিছুই না। হয়তো সবকিছু। আমরা জানি না।’
ভিডিও বিতর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলোচিত ইসলামি বক্তা মাওলানা গিয়াস উদ্দিন তাহেরী। তাহেরী বলেন, ‘সাতক্ষীরায় কী চলছে? মেয়ের বয়স ১৪, মেয়ের বাবার বয়স ৩৬, আর উনার বয়স ৭৪। কী হিসাব-নিকাশ! ধরা পড়ার আগে রোমান্টিক, ধরা পড়লে কয় বউ। এগুলো বিকৃত মানসিকতা।’
যদিও ঘটানার পর ফেইসবুক পোস্টে গাজী নজরুল ইসলাম ওই নারীকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করেন। তিনি জানান, ‘গত ১৩ জুলাই আমার প্রথমা ও দ্বিতীয় স্ত্রী, যথাক্রমে মোছা. মাকছুদা বেগম ও মোছা. মরিয়াম বেগমকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মো. মাসুম বিল্লাহর ব্যাবসায়িক অফিসে যাই। সেখানে আমরা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করি।’ এমপির দাবি, ‘আমরা উক্ত অফিসে অবস্থানকালে জোহরের নামাজ আদায়ের পূর্বে আমার গাড়িচালক ও আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যায়। পরবর্তীতে সে পাঁচ থেকে সাতজন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে আমাদের কক্ষে প্রবেশ করে এবং আমাদের জিম্মি করে ১ লক্ষ টাকা আদায় করে।’
সাতক্ষীরায় মিষ্টি বিতরণ ও ঝাড়ু মিছিল : সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। গতকাল ‘শ্যামনগরের সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে শ্যামনগর বাজার থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। যেখানে প্রতীকী ঘৃণা প্রকাশে ঝাড়ু দেখানো হয় মিছিল থেকে। এই সমাবেশ থেকে গাজী নজরুল ইসলামকে নিজ এলাকা শ্যামনগরে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, সংসদ সদস্য পদ বাতিল এবং অভিযোগের তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানানো হয়।
কর্মসূচিতে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আসা স্থানীয় বাসিন্দা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের কয়েকজনের হাতে গাজী নজরুল ইসলামের ছবি ও প্রতীকী ঝাড়ু দেখা যায়। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন।
তারা দাবি করেন, ‘এ ঘটনা নিয়ে সারা দেশে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। এতে শ্যামনগরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা চাই, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন