একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিচারব্যবস্থা। অপরাধ যত ভয়াবহই হোক না কেন, দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে পারলে আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট থাকে। রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আদালতের দেওয়া রায় সেই আস্থাকেই নতুন করে শক্তিশালী করেছে। দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা এই মামলায় মাত্র ২০ দিনের মধ্যে তদন্ত থেকে বিচার সম্পন্ন করে মৃত্যুদ-ের রায় ঘোষণা শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়; এটি বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থানেরও প্রতিফলন। এমন এক সময়ে, যখন নানা মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে, তখন রামিসা হত্যাকা-ের বিচার প্রক্রিয়া প্রমাণ করেছেÑ সদিচ্ছা, সমন্বয় এবং কার্যকর উদ্যোগ থাকলে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
আদালতের দেওয়া এই রায় জাতিকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে। মাত্র ২০ দিনের মধ্যে তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল, বিচার এবং মৃত্যুদ-ের রায়, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক বিরল নজির হয়ে থাকবে। এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, রাষ্ট্র চাইলে ন্যায়বিচার দ্রুত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
রামিসার ওপর যে নির্মমতা চালানো হয়েছে, তা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি তার মরদেহ বিকৃত করার যে ভয়াবহতা এই মামলায় উঠে এসেছে, তা সভ্য সমাজে কল্পনাতীত। এমন অপরাধের ক্ষেত্রে বিচার বিলম্বিত হলে সমাজে হতাশা জন্ম নেয়, অপরাধীরা উৎসাহ পায় এবং ভুক্তভোগী পরিবার বছরের পর বছর মানসিক যন্ত্রণা বহন করে। সেই জায়গা থেকে রাষ্ট্র, তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন টিম এবং বিচার বিভাগ যে সমন্বিত উদ্যোগে এত দ্রুত বিচার সম্পন্ন করেছে, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
বিশেষভাবে সরকারের আন্তরিকতা এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের নজরদারি এ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, দ্রুত তদন্তের নির্দেশনা এবং বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ দেখতে পেয়েছে যে রাষ্ট্র চাইলে অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
তবে রায় ঘোষণাই বিচার প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ নয়। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় মৃত্যুদ-ের রায় কার্যকর হওয়ার আগে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স, আপিল এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ আইনের সব বিধান মেনে দ্রুততম সময়ে এই প্রক্রিয়াগুলো শেষ করা। বিচার বিলম্বিত হলে জনমনে যে ইতিবাচক বার্তা সৃষ্টি হয়েছে, তা অনেকাংশে ম্লান হয়ে যেতে পারে।
আমরা বিশ্বাস করি, উচ্চ আদালতও এ মামলার কার্যক্রম যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে দ্রুত শুনানি সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ বিচার শুধু হতে হবে না, বিচার হয়েছে, এটিও জনগণের কাছে দৃশ্যমান হতে হবে।
রামিসা আর কখনো ফিরে আসবে না। তার পরিবারের শূন্যতা কোনো রায় পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সমাজকে একটি বার্তা দিতে পারে, শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। রাষ্ট্র এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আপসহীন।
আমরা সরকার, তদন্তকারী সংস্থা এবং বিচার বিভাগকে এই দ্রুত বিচারের জন্য ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করি, আইনি প্রক্রিয়ার সব ধাপ সম্পন্ন করে দ্রুত এই রায় কার্যকর করা হবে। রামিসার জন্য ন্যায়বিচারের পূর্ণতা সেখানেই। আর সেই পূর্ণতাই ভবিষ্যতে এমন নৃশংস অপরাধ প্রতিরোধে শক্তিশালী বার্তা হিসেবে কাজ করবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন