× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ০৯ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২৬, ০৬:৩৮ এএম

যুদ্ধের ময়দানে নতুন সেনাপতি : মানুষ নয়, অ্যালগরিদম

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২৬, ০৬:৩৮ এএম

যুদ্ধের ময়দানে নতুন সেনাপতি : মানুষ নয়, অ্যালগরিদম

একসময় যুদ্ধ মানেই ছিল মানুষের সিদ্ধান্ত, সামরিক কৌশল, দীর্ঘ পর্যালোচনা এবং নৈতিক দ্বিধার সমন্বয়। লক্ষ্য নির্ধারণ থেকে আক্রমণের অনুমোদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মানুষের বিবেক ও বিচারবোধের উপস্থিতি থাকত। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে এখন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ আর কেবল সৈন্য বনাম সৈন্যের লড়াই নয়; এটি পরিণত হয়েছে তথ্য, অ্যালগরিদম এবং যন্ত্রনির্ভর সিদ্ধান্তের প্রতিযোগিতায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন লক্ষ্য শনাক্ত করছে, তথ্য বিশ্লেষণ করছে, আক্রমণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়কে কয়েক সেকেন্ডে নামিয়ে আনছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, যুদ্ধ প্রবেশ করেছে এমন এক যুগে, যেখানে বোমাবর্ষণ ঘটতে পারে মানুষের চিন্তার গতিরও আগে।

যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক যুদ্ধ বলতে এমন এক সামরিক ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, নজরদারি, সাইবার আক্রমণ, ড্রোন পরিচালনা এবং রসদ ব্যবস্থাপনায় যন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে এ প্রযুক্তির ব্যবহার কয়েকটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থায়। এমন ড্রোন ও রোবট তৈরি হচ্ছে, যা মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও আক্রমণ করতে সক্ষম। দ্বিতীয়ত, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে। স্যাটেলাইট ছবি, গোয়েন্দা তথ্য, যোগাযোগের উপাত্ত এবং সেন্সরের মাধ্যমে সংগৃহীত বিপুল তথ্য কয়েক মুহূর্তে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য আক্রমণের পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, সাইবার যুদ্ধ। প্রতিপক্ষের যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো বা তথ্যভান্ডারে আক্রমণের ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হচ্ছে। চতুর্থত, তথ্যযুদ্ধ। ভুয়া ছবি, বিভ্রান্তিকর ভিডিও এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রচার চালিয়ে জনমত প্রভাবিত করার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

সিদ্ধান্ত সংকোচনের যুগ : বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন যে বিষয়টি নিয়ে, সেটি হলো ‘সিদ্ধান্ত সংকোচন’। আগে একটি সামরিক অভিযানে গোয়েন্দা বিশ্লেষক, আইনি উপদেষ্টা এবং উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য যাচাই করতেন। এখন সেই পুরো প্রক্রিয়া কয়েক সেকেন্ডে সম্পন্ন হচ্ছে। সেন্সর তথ্য সংগ্রহ করছে, যন্ত্র তা বিশ্লেষণ করছে, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা তৈরি করছে এবং কমান্ডারের সামনে সুপারিশ তুলে ধরছে। অনেক সময় মানুষের ভূমিকা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে কেবল অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতায়। ফলে প্রশ্ন উঠছেÑ মানুষ কি সত্যিই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, নাকি যন্ত্রের তৈরি সিদ্ধান্তে কেবল সিলমোহর দিচ্ছে?

ইরান সংঘাতে নতুন বাস্তবতা : ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়েই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ব্যবস্থা শত শত লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়তা করেছে। যে কাজ একসময় হাজারো বিশ্লেষকের দীর্ঘ সময় লাগত, এখন তা অল্পসংখ্যক মানুষের তত্ত্বাবধানে অল্প সময়েই সম্ভব হচ্ছে। সমর্থকদের মতে, এতে আক্রমণ আরও নিখুঁত হয় এবং ভুল কমে। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, গতি কি সবসময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে? দক্ষিণ ইরানের একটি স্কুলে হামলায় বহু শিশুসহ বিপুল প্রাণহানির ঘটনার পর সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, যন্ত্রের ভুল মূল্যায়ন কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তের পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

দায় নেবে কে? : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলোÑ ভুল হলে দায় কার? যদি কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সুপারিশে বেসামরিক মানুষ নিহত হন, তা হলে দায় কি সফটওয়্যার নির্মাতার? সামরিক কমান্ডারের? রাজনৈতিক নেতৃত্বের? নাকি সেই প্রতিষ্ঠানের, যারা এই প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে? আন্তর্জাতিক আইন এখনো এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি। সমস্যা হলো, দায়িত্ব যত বেশি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, জবাবদিহি তত দুর্বল হয়ে যায়। আর জবাবদিহি দুর্বল হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাবে?

যুদ্ধের বাইরে আরও একটি বড় উদ্বেগ রয়েছেÑ স্বয়ং-উন্নয়নশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিশ্বের কয়েকজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ভবিষ্যতে এমন ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে, যেখানে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই নিজের চেয়ে উন্নত সংস্করণ তৈরি করবে। নতুন সংস্করণ আবার আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করবে। এভাবে একপর্যায়ে মানুষের ভূমিকা প্রয়োজন হবে না। এই ধারাবাহিক স্ব-উন্নয়ন যদি বাস্তবে সম্ভব হয়, তা হলে তা অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তার পথ খুলে দিতে পারে। আশাবাদীরা মনে করেন, এতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, চিকিৎসা ও প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটবে। অন্যদিকে হতাশাবাদীরা আশঙ্কা করেন, মানুষের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে গেলে সভ্যতা এমন এক শক্তির মুখোমুখি হবে, যার সিদ্ধান্ত মানুষের পক্ষে বোঝা বা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

আইন পিছিয়ে, প্রযুক্তি এগিয়ে : বিশে^র বিভিন্ন দেশে এখন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরির আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির উন্নয়ন এত দ্রুত ঘটছে যে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্তে মানুষের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি সময়মতো কার্যকর নীতিমালা তৈরি না হয়, তা হলে ভবিষ্যতের যুদ্ধ আরও দ্রুত, আরও স্বয়ংক্রিয় এবং আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে।

মানবতার সামনে কঠিন প্রশ্ন : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুদ্ধক্ষেত্রে অভূতপূর্ব গতি, বিশ্লেষণক্ষমতা এবং কার্যকারিতা এনে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি সামনে এনেছে গভীর নৈতিক সংকট। প্রযুক্তি কি মানুষের সেবক থাকবে, নাকি মানুষের সিদ্ধান্তকে অতিক্রম করবে? দক্ষতা কি নৈতিকতার বিকল্প হতে পারে? যুদ্ধের দায় কি যন্ত্রের আড়ালে হারিয়ে যাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা। তবে একটি বিষয় স্পষ্টÑ প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানবিক বিবেচনা, জবাবদিহি এবং নৈতিক দায়িত্বের বিকল্প নেই। মানবসভ্যতা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হতে পারে উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী সহযাত্রী, আবার নিয়ন্ত্রণহীন হলে হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় বিপদের উৎস। ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করবে মানুষ প্রযুক্তিকে কতটা প্রজ্ঞা, সংযম ও মানবিকতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারে তার ওপর।

 

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!