যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আশপাশে গড়ে উঠেছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিশাল জাল। হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকে মাত্র ৫০০ মিটারের মধ্যে গড়ে উঠেছে অন্তত ২২টি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, এর মধ্যে ২০টিরই হালনাগাদ লাইসেন্স নেই। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের টার্গেট করেই এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডে সরকারি হাসপাতালের সামনের এলাকায় একাধিক ভবনে পাশাপাশি গড়ে উঠেছে এসব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। একই ভবনের কয়েকটি তলাজুড়ে একাধিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। ফলে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি।
একটি ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পরিচালিত হচ্ছে ইউনিক হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। হাসপাতালের প্রধান গেটের সামনেই এর অবস্থান। একই ভবনের নিচতলায় রয়েছে কমটেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার। পাশের অংশে রয়েছে অর্থোপেডিক ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। একই এলাকায় রয়েছে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাবজোন স্পেশালাইজড হসপিটালসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
এছাড়া আশপাশের ভবনগুলোতে রয়েছে ডক্টরস ল্যাব অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, ইসলামী ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্রিন্স ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আল্ট্রাভিশন হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পিয়ারলেস ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ডিএনএ ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব নিয়ম-কানুন মানার কথা, তার অনেক কিছুই উপেক্ষা করা হচ্ছে। গত মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ডিএনএ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও পিয়ারলেস ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা করা হয়। তবে অভিযানের কিছুদিন পর প্রতিষ্ঠান দুটি আবার চালু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালের সামনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ হলো সেখানে আসা রোগীদের সহজে আকৃষ্ট করা। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ করা দালালরা সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছেন। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, দালালের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার পর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরীক্ষা করানোর অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, দক্ষ টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকলেও রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্ট ও দক্ষ জনবল না থাকায় রিপোর্টের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
কমটেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে যে, সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে। একইভাবে ইউনিক হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধেও নানা অনিয়ম ও অপচিকিৎসার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কেউ নিজ নামে, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নামে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। সরকারি হাসপাতালের রোগীদের চিকিৎসা শেষে এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সামনে একই ভবনে একাধিক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপনের বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, গত মাসে ডিএনএ ও পিয়ারলেস ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও নজরদারিতে রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, রোগীদের নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, জনবল, যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসার মান নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন