বিশ্বকাপ ফুটবলে একটি হ্যাটট্রিক মানেই ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম খোদাই করে ফেলা। চার বছর পরপর আয়োজিত এই মহারণে একটি গোল করাই যেখানে অনেকের স্বপ্ন, সেখানে এক ম্যাচে তিন বা তার বেশি গোল করা নিঃসন্দেহে অসাধারণ কৃতিত্ব। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে বহু কিংবদন্তি ফুটবলার হ্যাটট্রিক করেছেন, কিন্তু কিছু হ্যাটট্রিক শুধু গোলের সংখ্যার জন্য নয়, বরং এর পেছনের নাটকীয়তা, বিতর্ক, বিস্ময় এবং আবেগের কারণেও বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
প্রথম বিশ্বকাপেই হ্যাটট্রিকের সূচনা
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম ফিফা বিশ্বকাপেই ফুটবলপ্রেমীরা হ্যাটট্রিকের স্বাদ পান। যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট প্যাটেনড প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করেন। একই আসরে আর্জেন্টিনার গুইয়ের্মো স্তাবিলে নিজের অভিষেক আন্তর্জাতিক ম্যাচেই তিন গোল করে সবাইকে চমকে দেন। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই তাই হ্যাটট্রিক হয়ে ওঠে ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণীয় অর্জন।
চার গোল করেও জয় মেলেনি
১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও পোল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচটি আজও অন্যতম নাটকীয় লড়াই হিসেবে বিবেচিত হয়। পোল্যান্ডের আর্নেস্ত ইউলিমোস্কি একাই চার গোল করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল একটি হ্যাটট্রিক। কিন্তু তার এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সও দলকে রক্ষা করতে পারেনি। ব্রাজিল শেষ পর্যন্ত ৬-৫ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নেয়। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, একই ম্যাচে ব্রাজিলের লিওনিদাসও হ্যাটট্রিক করেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক ম্যাচে দুই দলের দুই খেলোয়াড়ের হ্যাটট্রিকের এমন ঘটনা এখনো বিরল এবং প্রায় অনন্য।
পেলের বিশ্বজয়ের সূচনা
১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপের আগে তরুণ পেলের নাম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খুব বেশি পরিচিত ছিল না। কিন্তু সুইডেনে অনুষ্ঠিত সেই আসরের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে তিনি এমন এক হ্যাটট্রিক করেন, যা ফুটবল ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মাত্র ১৭ বছর বয়সে পেলে অসাধারণ দক্ষতায় তিনটি গোল করেন। তার প্রথম গোল আসে গোলরক্ষকের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে, দ্বিতীয়টিতে ডিফেন্ডারের কাছ থেকে বল ছিনিয়ে নিয়ে জালে পাঠান এবং তৃতীয় গোলটি করেন দৃষ্টিনন্দন ভলিতে। সেই ম্যাচের পর বিশ্ব বুঝতে পারে, ফুটবল নতুন এক মহাতারকার জন্ম দেখছে। পরবর্তী সময়ে ফাইনালেও গোল করে ব্রাজিলকে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন পেলে।
এক ম্যাচে পাঁচ গোলÑ অদ্বিতীয় সালেঙ্কো
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ পাঁচ গোল করার রেকর্ড এখনো রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কোর দখলে। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিপক্ষে তিনি একাই পাঁচবার বল জালে পাঠিয়ে রাশিয়াকে ৬-১ গোলের জয় এনে দেন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই ঐতিহাসিক কীর্তির পরও সালেঙ্কো আন্তর্জাতিক ফুটবলে বড় কোনো তারকায় পরিণত হননি। তবু একটি ম্যাচের অসাধারণ নৈপুণ্যই তাকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের বিশেষ স্থানে বসিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা থেকে নায়ক হওয়ার গল্প
পাওলো রসির জীবন যেন সিনেমার চিত্রনাট্য। ম্যাচ পাতানোর অভিযোগে নিষিদ্ধ হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ। কিন্তু ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়ে তিনি বদলে দেন সব হিসাব।
প্রথম দিকের ম্যাচগুলোতে গোল না পাওয়ায় সমালোচনা আরও বাড়ে। কিন্তু দ্বিতীয়পর্বে ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে রসি হ্যাটট্রিক করে ইতালিকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেন। এরপর পুরো টুর্নামেন্টে ছয় গোল করে তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জেতেন এবং ইতালির বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠেন। ফুটবল ইতিহাসে প্রত্যাবর্তনের অন্যতম সেরা উদাহরণ হিসেবে আজও তার নাম উচ্চারণ করা হয়।
ফাইনালে একমাত্র হ্যাটট্রিক এবং বিতর্কের জন্ম
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্ট এমন একটি কীর্তি গড়েন, যা এখনো কেউ স্পর্শ করতে পারেননি। পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে তিনি হ্যাটট্রিক করেন এবং ইংল্যান্ডকে প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ জিততে সাহায্য করেন।
তবে তার দ্বিতীয় গোলটি আজও বিতর্কের বিষয়। অতিরিক্ত সময়ে নেওয়া শট ক্রসবারে লেগে নিচে পড়ে ফিরে আসে। ইংল্যান্ড গোলের দাবি করলেও জার্মান খেলোয়াড়রা মনে করেছিলেন বলটি পুরোপুরি গোললাইন অতিক্রম করেনি। রেফারি ও লাইন্সম্যান গোলের সিদ্ধান্ত দেন এবং সেই সিদ্ধান্তই ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে যায়। শেষ মুহূর্তে হার্স্ট আরও একটি গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন।
বিশ্বকাপে একাধিক হ্যাটট্রিকের বিরল কীর্তি
বিশ্বকাপের ইতিহাসে একাধিক হ্যাটট্রিক করা খেলোয়াড়ের সংখ্যা খুবই কম। হাঙ্গেরির সান্দোর ককসিচ, ফ্রান্সের জুস্ট ফঁতেন, জার্মানির গার্ড মুলার এবং আর্জেন্টিনার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাÑ এই চারজন বিশ্বকাপে দুটি করে হ্যাটট্রিক করার অনন্য কীর্তি গড়েছেন। তাদের ধারাবাহিক গোল করার ক্ষমতা আজও ফুটবল ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
আধুনিক যুগে হ্যাটট্রিকের নতুন অধ্যায়
২০১৮ সালের বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর হ্যাটট্রিক আধুনিক ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তার তিনটি গোল, বিশেষ করে শেষ মুহূর্তের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক, ম্যাচকে ৩-৩ সমতায় শেষ করে এবং বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স হিসেবে জায়গা করে নেয়।
হ্যাটট্রিকের আসল মাহাত্ম্য
বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক মানে শুধু তিনটি গোল নয়; এটি সাহস, দক্ষতা, চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং বড় মঞ্চে নিজের সেরাটা তুলে ধরার প্রতীক। আর্নেস্ত ইউলিমোস্কির পরাজয়ের বেদনা, পেলের উত্থান, সালেঙ্কোর বিস্ময়কর পাঁচ গোল, পাওলো রসির প্রত্যাবর্তন কিংবা জিওফ হার্স্টের বিতর্কিত ইতিহাসÑ সব মিলিয়ে হ্যাটট্রিক বিশ্বকাপকে আরও রোমাঞ্চকর ও কিংবদন্তিময় করে তুলেছে। তাই প্রতিটি বিশ্বকাপেই ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষায় থাকেন, আবার কবে জন্ম নেবে নতুন কোনো অবিস্মরণীয় হ্যাটট্রিকের গল্প।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন