বাংলার ঋতুচক্রে জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মানেই ফলের উৎসব। গাছভর্তি আম, লিচু, কাঁঠাল, জাম, আনারস ও নানা মৌসুমি ফলের সমারোহে প্রকৃতি যেন তার উদারতার ভা-ার উন্মুক্ত করে দেয়। বাজারে বাজারে তখন রঙিন ফলের বাহার। শহর থেকে গ্রাম, সুপারশপ থেকে ফুটপাত, সর্বত্র মৌসুমি ফলের পসরা। এসব ফল শুধু মানুষের রসনাতৃপ্তিই করে না, বরং ভিটামিন, খনিজ ও প্রয়োজনীয় পুষ্টির অন্যতম উৎস হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মৌসুমি ফলের গুরুত্ব অপরিসীম।
কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ফলের মৌসুম এলেই আনন্দের পাশাপাশি এক ধরনের অজানা আশঙ্কাও ভর করে মানুষের মনে। বাজারে সাজিয়ে রাখা উজ্জ্বল রঙের আম, টসটসে লিচু কিংবা চকচকে আপেল দেখে যেমন জিভে পানি আসে, তেমনি মনে প্রশ্নও জাগেÑ এসব ফল কতটা নিরাপদ?
বছরের পর বছর ধরে ফল দ্রুত পাকানো, দীর্ঘদিন সতেজ রাখা এবং বাজারে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ উঠে আসছে। ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, ইথোফেন কিংবা মাত্রাতিরিক্ত সংরক্ষণকারী রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ে জনমনে উদ্বেগ কম নয়। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, এসব উপাদানের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
শিশুরা এই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার। কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক কম এবং শরীরের বিকাশমান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাবের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। একজন অভিভাবক সন্তানের সুস্বাস্থ্যের কথা ভেবে বাজার থেকে ফল কিনে আনেন। কিন্তু সেই ফল যদি পুষ্টির পরিবর্তে রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির জন্য উদ্বেগের বিষয়।
প্রতি বছর ফলের মৌসুমে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হয়। অনিয়মের দায়ে জরিমানা করা হয়, কখনো কখনো পণ্য জব্দ ও ধ্বংসও করা হয়। এসব উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব অভিযান কতটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে?
ফলের বাগান থেকে শুরু করে আড়ত, পাইকারি বাজার, পরিবহন এবং খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র, প্রতিটি স্তরে নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাদামতলীসহ দেশের বড় বড় ফলের আড়তগুলোতে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণ এবং আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। কোনো ব্যবসায়ী বা সরবরাহকারী ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে এমন শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যা অন্যদের জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
তবে শুধু শাস্তি দিয়েই সমস্যার সমাধান হবে না। কৃষক, ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত মুনাফার আশায় কিংবা সচেতনতার অভাবে ক্ষতিকর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। নিরাপদ উপায়ে ফল পাকানো ও সংরক্ষণের প্রযুক্তি সহজলভ্য করা গেলে অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকারীদের উৎসাহিত করতে প্রণোদনার ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
ফলের মৌসুম আমাদের সংস্কৃতি, কৃষি অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই মৌসুম যেন আনন্দ, পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্যের বার্তা বয়ে আনেÑ সেটিই সবার প্রত্যাশা। কিন্তু যদি সেই ফলই মানুষের মনে ভয় ও সংশয়ের জন্ম দেয়, তা হলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই সময় এসেছে অভিযাননির্ভর সাময়িক উদ্যোগের গ-ি পেরিয়ে একটি স্থায়ী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক খাদ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন