তারল্য সংকট মোকাবিলায় ইসলামী ব্যাংককে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রোববার দুপুরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ সহায়তা দেওয়া হয়। এরপর রোববার বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জানা যায়, কোরবানির ঈদের পর ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটিতে অস্থিরতা শুরু হয়। তার নিয়োগের বিরোধিতা করে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে আন্দোলনকারীরা ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক ব্যাংকটি থেকে আমানত তুলে নিতে শুরু করলে তারল্য সংকট দেখা দেয়। ফলে অনেক গ্রাহকের অর্থ উত্তোলনের চাহিদা পূরণে হিমশিম খেতে হয় ব্যাংকটিকে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) হারও বজায় রাখতে পারেনি।
গ্রাহকদের ব্যাপক আমানত প্রত্যাহারের কারণে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকটি বড় ধরনের তারল্য চাপে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা দেয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ সহায়তার মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা নগদ অর্থ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৫০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে আন্তঃব্যাংক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সেবা সচল রাখতে। এই সহায়তার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং গ্রাহকদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এদিকে চলমান তারল্য পরিস্থিতি ও গ্রাহকদের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে বসে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শীর্ষ কর্মকর্তারা। গতকাল রোববার বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব), দুজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ছয়জন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক। বৈঠকে ব্যাংকের চলমান পরিস্থিতি, তারল্য অবস্থা এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভর্নরকে অবহিত করা হয়।
এর আগে গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর মতিঝিলে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন আমানতকারী ও গ্রাহকেরা। কর্মসূচি থেকে তারা সাত দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা দেন। এদিন সকাল ১০টার দিকে মতিঝিলের দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে এ কর্মসূচি শুরু হয়। এতে শত শত আমানতকারী ও গ্রাহক অংশ নেন।
ইসলামী ব্যাংকের নিউমার্কেট শাখার আমানতকারী আরাফাত বলেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা শুধু গ্রাহকদের নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আমি ২০১০ সাল থেকে এই ব্যাংকে লেনদেন করি। ব্যাংকটিকে যেকোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাট থেকে রক্ষা করা গ্রাহক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। আমানতকারী জয়নাল জানান, ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক ব্যাংকটির ওপর আস্থা রেখেছেন। ব্যাংকের কোনো ক্ষতি হলে আমানতকারীদের স্বার্থও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে তারা কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, পরিচালনা পর্ষদে সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের একটি অংশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণের দাবি জানান তারা।
এর আগে শনিবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম সাত দফা দাবি ঘোষণা করে। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির আহ্বায়ক ও মুখপাত্র নুর উন-নবী বলেন, গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা, আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রতিবাদে তারা এ কর্মসূচি পালন করছেন। ফোরামের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যানকে অপসারণ করে ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিকে নিয়োগ, ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রকৃত মালিকদের অধিকার নিশ্চিত করা, ব্যাংক খাতে সংঘটিত অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকগুলোতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকা, অপপ্রচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকের দায় পরিশোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও জানানো হয়।
উল্লেখ্য, গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করলে একই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ব্যাংকটির স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই ব্যাংকটিকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা, বিতর্ক এবং গ্রাহকদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সচেতন গ্রাহক ফোরাম ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন