ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত এবং মর্যাদাপূর্ণ বস্তুটির নাম ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বজয়ী অধিনায়কের হাতে যে সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরতে দেখা যায়, তার আর্থিক মূল্যের চেয়ে ঐতিহাসিক মূল্য অতুলনীয়। তবে ফুটবলীয় আবেগের বাইরে এই ট্রফিটি নিখুঁত ভাস্কর্যশিল্প, আধুনিক ধাতুবিদ্যা এবং উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত অনন্য সম্পদ। ১৯৭১ সালে নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই ট্রফিটি ঘিরে রয়েছে কঠোর গোপনীয়তা, কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং এর তৈরি হওয়ার এক নিখুঁত প্রযুক্তিগত ইতিহাস।
ইতালিয়ান ভাস্করের নকশা
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ফিফার তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী আগের জুলে রিমে ট্রফিটি চিরতরে নিজেদের করে নেয়। ফলে ১৯৭১ সালে ফিফাকে একটি নতুন ট্রফি তৈরির উদ্যোগ নিতে হয়। নতুন ট্রফির নকশা জমা দেওয়ার জন্য বিশ্বজুড়ে উন্মুক্ত আহ্বান জানানো হলে সাতটি দেশের কারিগররা মোট ৫৩টি নকশা জমা দেন। সমস্ত নকশাকে পেছনে ফেলে ফিফার মন জয় করে নেয় ইতালির মিলান শহরের প্রখ্যাত ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার তৈরি করা একটি স্কেচ। গাজ্জানিগা তার তৈরি নতুন ট্রফির নকশায় ফুটবলের বৈশ্বিক আবেদনকে এক অনন্য রূপক দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন। ট্রফিটির দিকে তাকালে দেখা যায়, নিচ থেকে দুটি মানবমূর্তি বা অ্যাথলেট সগৌরবে হাত বাড়িয়ে পুরো পৃথিবীকে (গ্লোব) পিঠে ধারণ করে আছে। গাজ্জানিগা তার এই সৃষ্টি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘লাইনগুলো নিচ থেকে সর্পিলাকারে উঠে এসে পুরো বিশ্বকে জড়িয়ে ধরেছে। এটি আসলে ম্যাচ জয়ের পর ফুটবলারের অদম্য গতি, গতিশীলতা এবং উল্লাসের চিরন্তন রূপক।’ ইতালির বিখ্যাত ট্রফি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বার্টোনি এফএএ এই নকশা অনুযায়ী মূল ট্রফিটি তৈরির দায়িত্ব পায়।
নিরেট সোনা ও অন্যান্য উপাদান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিটি দেখতে যতটা আকর্ষণীয়, এর ভেতরের ধাতব গঠন ততটাই নিখুঁত ও ভারী। বিজ্ঞান এবং ধাতুবিদ্যার পরিমাপ অনুযায়ী এই ট্রফির মূল উপাদান ও গঠনশৈলীর বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
স্বর্ণ : ট্রফিটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে ১৮ ক্যারাট বিশুদ্ধ নিরেট স্বর্ণ, যা মোট উপাদানের প্রায় ৭৫ শতাংশ।
ওজন ও উচ্চতা : ট্রফিটির মোট উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার (১৪.৫ ইঞ্চি) এবং এর মোট ওজন ৬.১৭৫ কেজি। এর মধ্যে প্রায় ৪.৯ কেজিই নিরেট স্বর্ণ।
ভেতরের গঠন : ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মার্টিন পলিয়াকভের মতে, ট্রফিটি যদি সম্পূর্ণ নিরেট স্বর্ণ দিয়ে তৈরি হতো, তবে এর ওজন দাঁড়াত প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কেজি, যা একজন ফুটবলারের পক্ষে উঁচিয়ে ধরা অসম্ভব ছিল। তাই ট্রফিটির ভেতরের অংশটি বৈজ্ঞানিক কৌশলে আংশিক ফাঁপা রাখা হয়েছে, যাতে এর ওজন মানুষের বহনযোগ্য সীমার মধ্যে থাকে।
ভিত্তি : ট্রফির নিচের বৃত্তাকার বেইসে দুই স্তরে গাঢ় সবুজ রঙের মূল্যবান খনিজ পাথর ম্যালাকাইট ব্যবহার করা হয়েছে। এই সবুজ রঙের স্তরটি মাঠের সবুজ ঘাসের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
আসল ট্রফি ও ব্রোঞ্জের রেপ্লিকা
ফিফার বর্তমান নিয়ম অত্যন্ত কঠোর এবং স্পষ্ট। আসল স্বর্ণের ট্রফিটি স্থায়ীভাবে কোনো দেশ বা ফুটবল ফেডারেশনকে নিজেদের কাছে রাখতে দেওয়া হয় না। ফাইনাল ম্যাচ শেষে মূল মঞ্চে পুরস্কার বিতরণের সময় আসল ট্রফিটি চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়কের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু মাঠের উদযাপন এবং আনুষ্ঠানিক ছবি তোলা শেষ হওয়া মাত্রই ফিফার অফিশিয়াল প্রতিনিধিরা আসল ট্রফিটি নিজেদের জিম্মায় ফিরিয়ে নেন।
আসল ট্রফিটির পরিবর্তে চ্যাম্পিয়ন দেশকে একটি রেপ্লিকা বা অনুলিপি দেওয়া হয়, যা দেখতে হুবহু মূল ট্রফির মতোই। তবে এই রেপ্লিকাটি নিরেট স্বর্ণ দিয়ে তৈরি নয়; এটি মূলত ব্রোঞ্জের তৈরি এবং এর ওপর নিখুঁত স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া থাকে। এই রেপ্লিকা ট্রফিটিই চ্যাম্পিয়ন দল তাদের দেশে নিয়ে যায় এবং স্থায়ীভাবে তাদের ক্যাবিনেটে প্রদর্শন করে। আর আসল ট্রফির নিচের অংশে প্রতি আসরের চ্যাম্পিয়ন দেশের নাম এবং সাল খোদাই করে যুক্ত করা হয়।
কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা
যেহেতু জুলে রিমে ট্রফিটি ইতিহাসে দুবার (১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে এবং ১৯৮৩ সালে ব্রাজিলে) চুরি হয়েছিল, তাই বর্তমান ফিফা ট্রফির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্স সিস্টেমের সমতুল্য করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত ফিফার প্রধান কার্যালয়ের মাটির নিচে তৈরি একটি বিশেষ হাই-টেক ভল্টে এই ট্রফিটি বছরের সিংহভাগ সময় অত্যন্ত কড়া সুরক্ষায় লক করে রাখা হয়। এই ভল্টের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং মোশন সেন্সর সার্বক্ষণিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। স্পনসরশিপ চুক্তির অংশ হিসেবে টুর্নামেন্টের আগে যখন ‘কোকা-কোলা ট্রফি ট্যুর’-এর মাধ্যমে ট্রফিটি বিশ্বভ্রমণে বের করা হয়, তখন এর নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ওপর। ট্রফিটি পরিবহনের জন্য একটি কাস্টম-মেড বুলেটপ্রুফ এবং লকিং সিস্টেমযুক্ত বিশেষ স্যুটকেস বা কেস ব্যবহার করা হয়, যা লাক্সারি ব্র্যান্ড লুই ভিঁট তৈরি করে থাকে। ট্রফিটি যখনই জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়, তখন এটি একটি সেন্সরযুক্ত বুলেটপ্রুফ গ্লাস বক্সের ভেতর রাখা হয় এবং চারপাশে বিশেষ সশস্ত্র প্রহরী মোতায়েন থাকে। কেবল রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার ছাড়া অন্য কারো এই আসল ট্রফিটি খালি হাতে স্পর্শ করার আইনি অধিকার নেই।
এই নিরেট স্বর্ণ আর অভেদ্য নিরাপত্তার সমীকরণই ফিফা ট্রফিকে বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও মূল্যবান ক্রীড়া স্মারক করে রেখেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন