২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘আই’-এ ২২ জুন মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপের নরওয়ে ও আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল সেনেগাল। এটি শুধু একটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ নয়, বরং দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শন, দুই ভিন্ন মহাদেশ এবং দুই ভিন্ন ইতিহাসের সংঘর্ষ। একদিকে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে আসা নরওয়ে, অন্যদিকে আফ্রিকার ফুটবলের অন্যতম সফল প্রতিনিধিদের একটি সেনেগাল। নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয়ে ম্যাচটি দুই দলের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপের মঞ্চে এর আগে কখনো মুখোমুখি না হওয়ায় ম্যাচটি ঘিরে আগ্রহও বেশি। ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষায় আছেন দেখতে, ইউরোপের উদীয়মান শক্তি নরওয়ে নিজেদের প্রত্যাবর্তনের গল্প আরও উজ্জ্বল করতে পারে কি না, নাকি আফ্রিকার গর্ব সেনেগাল আবারও বড় মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দেবে।
২৮ বছর পর নরওয়ের প্রত্যাবর্তন
নরওয়ের বিশ্বকাপ ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়, তবে বেশ কিছু স্মরণীয় মুহূর্তে ভরা। দেশটি প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয় ১৯৩৮ সালে। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯৪ সালে আবার বিশ্বকাপে ফিরে আসে এবং ১৯৯৮ সালে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়ে নিজেদের সেরা সাফল্য অর্জন করে।
তবে ১৯৯৮ সালের পর নরওয়ের জন্য শুরু হয় হতাশার অধ্যায়। একের পর এক বাছাইপর্বে ব্যর্থ হয়ে তারা বিশ্বকাপ থেকে দূরে থাকে। প্রায় তিন দশক পর ২০২৬ সালে আবারও বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়ে দেশটি নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
বর্তমান নরওয়ে দলকে অনেকেই তাদের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচনা করছেন। আক্রমণভাগে আছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলদাতা এরলিং হালান্ড। মাঝমাঠে আছেন মার্টিন ওদেগার্ড, যিনি খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণ সাজানোর ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষ। এ ছাড়া আলেকজান্ডার সোরলথ, অ্যান্টোনিও নুসা এবং ক্রিস্টোফার আয়েরের মতো খেলোয়াড়রা দলটিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
সেনেগালের বিশ্বকাপ রূপকথা
আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাসে সেনেগাল একটি অনুপ্রেরণার নাম। ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই তারা পুরো বিশ্বকে চমকে দেয়। উদ্বোধনী ম্যাচে তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে তারা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দেয়।
সেই আসরে সেনেগাল কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে আফ্রিকার ফুটবলে নতুন ইতিহাস রচনা করে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে বিশ্বকাপে ফিরে এলেও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়। তবে ২০২২ সালে তারা শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেয় এবং নিজেদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। ২০২১ সালে আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ের মাধ্যমে সেনেগাল নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিরোপা অর্জন করে। সেই সাফল্য তাদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। বর্তমান দলে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের চমৎকার সমন্বয় রয়েছে। সাদিও মানে, কালিদু কৌলিবালি, এদুয়ার মেন্ডি, ইসমাইলা সার এবং পাপে গুইয়ের মতো খেলোয়াড়রা সেনেগালকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী দলে পরিণত করেছে।
ইতিহাস নাকি নতুন অধ্যায়?
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেনেগাল নিঃসন্দেহে বেশি সফল দল। তাদের রয়েছে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা এবং বড় দলকে হারানোর ঐতিহ্য। অন্যদিকে নরওয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিশ্বমঞ্চে ফিরে নতুন ইতিহাস লেখার স্বপ্ন দেখছে। ২২ জুনের ম্যাচটি তাই শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়; এটি হবে অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাবর্তনের, আফ্রিকান গর্ব ও ইউরোপীয় উচ্চাকাক্সক্ষার, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের এক আকর্ষণীয় সংঘর্ষ। সেনেগাল কি তাদের বিশ্বকাপ ঐতিহ্য ধরে রাখবে, নাকি হালান্ড-ওদেগার্ডদের নেতৃত্বে নরওয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে। সেই উত্তর খুঁজতেই মুখিয়ে আছে ফুটবল বিশ্ব।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন