× UCB Sticker Card
সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মো. সায়েম ফারুকী

প্রকাশিত: জুন ২২, ২০২৬, ০২:৩২ এএম

উচ্চতার ছাড়পত্রে ঘুষের কারবার!

মো. সায়েম ফারুকী

প্রকাশিত: জুন ২২, ২০২৬, ০২:৩২ এএম

উচ্চতার ছাড়পত্রে ঘুষের কারবার!

একটি ভবন কত তলা হবে, কত ফুট পর্যন্ত মাথা তুলতে পারবে, সেই সিদ্ধান্ত শুধু নগর পরিকল্পনার বিষয় নয়। বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকায় এটি সরাসরি জড়িয়ে আছে উড়োজাহাজের নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণের সঙ্গে। সেই স্পর্শকাতর ‘উচ্চতার ছাড়পত্র’ (হাইট ক্লিয়ারেন্স) নিয়েই এবার উঠেছে ভয়াবহ অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কোটি কোটি টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) উচ্চতার ছাড়পত্র প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার তথ্য। অভিযোগ উঠেছে, অনলাইনে আবেদন করলেও ঘুষ ছাড়া মিলছে না ছাড়পত্র। আবার নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা দিলে শুধু দ্রুত অনুমোদনই নয়, বিধি অনুযায়ী যতটুকু উচ্চতা পাওয়ার কথা, তার চেয়েও বেশি উচ্চতার ছাড়পত্র মিলছে।

এমন গুরুতর অভিযোগ তুলে সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা বাদশা দিদারুল। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বেবিচক চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। সেই নির্দেশনার একটি অনুলিপি রূপালী বাংলাদেশের হাতে এসেছে।

জানা গেছে, ডিজিটাল সেবা সহজ করার উদ্দেশ্যে উচ্চতার ছাড়পত্র আবেদন অনলাইনে নেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক আবেদনকারীকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, নিয়ম মেনে আবেদন জমা দেওয়ার পরও ১৫ দিন থেকে চার মাস পর্যন্ত ফাইল আটকে থাকে। অথচ দালাল বা প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যোগাযোগ করে আর্থিক সুবিধা দিলে একই ধরনের আবেদন কয়েক দিনের মধ্যেই অনুমোদন পেয়ে যায়।

নির্মাণসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানান, ভবন নির্মাণে সময়ই সবচেয়ে বড় সম্পদ। ব্যাংক ঋণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ফ্ল্যাট বিক্রি এবং বিনিয়োগের পুরো পরিকল্পনা নির্ভর করে সময়মতো ছাড়পত্র পাওয়ার ওপর। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই আবেদনকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশটি হলো, নির্ধারিত সীমার চেয়েও বেশি উচ্চতার ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি। লিখিত অভিযোগে একাধিক নির্দিষ্ট ছাড়পত্র নম্বর উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে, প্রকৃত অনুমোদনযোগ্য উচ্চতার তুলনায় অতিরিক্ত উচ্চতা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কোথাও ৫১ ফুটের পরিবর্তে ৬৯ ফুট, ৫৯ ফুটের স্থলে ১০৭ ফুট, ৩৪ ফুটের জায়গায় ৭৮ ফুট, আবার ১৮৬ ফুটের পরিবর্তে ২১৫ ফুট পর্যন্ত উচ্চতার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, এসব অনুমোদনের বিপরীতে কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে। লিখিত অভিযোগে বেবিচকের সিনিয়র কার্টোগ্রাফার মো. শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ এবং অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালক (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) মো. শামসুল হকসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, শফিকুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরের অবস্ট্যাকল লিমিটেশন সারফেস (ওএলএস) এলাকার আওতাভুক্ত সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি অনানুষ্ঠানিক প্রতিনিধি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই আবেদন সংগ্রহ, তদবির এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে।

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, ওএলএস কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) নির্ধারিত নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ।

বিমানবন্দরের চারপাশে কোথায় কত উচ্চতার ভবন নির্মাণ করা যাবে, তা সম্পূর্ণ কারিগরি বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। কোনো স্থাপনা অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করলে তা উড়োজাহাজের নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বেবিচকের সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ওএলএস-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয় নয়। এটি পুরোপুরি নিরাপত্তাভিত্তিক। অভিযোগ সত্য হলে সেটি শুধু দুর্নীতি নয়, বিমান চলাচলে নিরাপত্তার বিষয়ও।

মন্ত্রণালয়ে দেওয়া লিখিত অভিযোগে ঘুষ বাণিজ্য, আবেদন ঝুলিয়ে রাখা, বিধিবহির্ভূত উচ্চতার অনুমোদন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়গুলো তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বেবিচক চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্তের অগ্রগতি জানাতে নির্দেশ দিয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, অভিযোগটিকে  প্রশাসনিকভাবেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আবাসন খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজন উদ্যোক্তার অভিযোগ, উচ্চতার ছাড়পত্রের সরকারি অনলাইন ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে আবেদন নিষ্পত্তি নির্ভর করছে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের ওপর। তাদের ভাষ্য, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কিন্তু যদি আবেদনকারীকে শেষ পর্যন্ত দালালের দ্বারস্থ হতে হয়, সেক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকারিতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি সেবায় অস্বাভাবিক বিলম্বই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র তৈরি করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং নিশ্চিত করা গেলে ঘুষ ও তদবিরের সুযোগ অনেকটাই কমে আসে।

তারা মনে করেন, উচ্চতার ছাড়পত্রের প্রতিটি অনুমোদনের কারিগরি ভিত্তি, অনুমোদিত উচ্চতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ অনলাইনে উন্মুক্ত করলে জবাবদিহি আরও বাড়বে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে সিনিয়র কার্টোগ্রাফার শফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি এসব অনৈতিক কাজে জড়িত নই। আমি এসব বিষয়ে কিছুই জানি না। এসব সিনিয়র স্যারেরা জানেন।’

পরিচালক (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) মো. শামসুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘কার্টোগ্রাফারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলছে। তবে এই অভিযোগে আমার নাম যে কেন জড়ানো হলো তা আমার বোধগম্য নয়। আমি কারো কাছ থেকে টাকা নেওয়া দূরের কথা, কখনোই কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।’ তিনি আরও বলেন, ‘কার্টোগ্রাফাররা এই ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকে। এর আগে আব্দুস সোবহান নামে একজন ছিলেন। তিনিও এই ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাকে আমরা কক্সবাজারে সরিয়ে দিয়েছি দুই বছর আগে। পরে কার্টোগ্রাফার শফিকুল ইসলামকে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়। কাজ করতে করতে কি করছে না করছে, হয়তো তিনিই (শফিকুল) ভালো জানেন, আর আল্লাহ ভালো জানেন। এখন তো কমপ্লেইন আসছে। তার সঙ্গে কেন যে আমার নাম জড়ালো বুঝতে পারছি না। আমি কখনো এগুলোর সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। এখনো নেই। এখন তদন্ত হচ্ছে, তদন্তেই বেরিয়ে আসবে, কে দোষী আর কে নির্দোষ।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চতার ছাড়পত্র কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সনদ নয়; এটি একটি নিরাপত্তা সনদ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আকাশপথের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মান রক্ষা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং জনস্বার্থ। তাই এই সেবাকে ঘিরে যদি ঘুষ, দালালচক্র, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা বিধিবহির্ভূত অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে, তবে তা শুধু দুর্নীতির ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও বিমান নিরাপত্তার প্রশ্নও বটে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চতার ছাড়পত্রের মতো স্পর্শকাতর সেবায় স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিনির্ভর জবাবদিহি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হতে পারে এই বিতর্কের একমাত্র কার্যকর সমাধান।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!