যুদ্ধ, তীব্র দাবদাহ এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার সম্মিলিত প্রভাবে নজিরবিহীন বিদ্যুৎ সংকটে পড়েছে ইরান। রাজধানী তেহরান থেকে দক্ষিণ উপকূল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের হাজার হাজার সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অন্ধকারে থমকে গেছে মানুষের জীবন : তেহরানের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় অনলাইন পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েও শেষ মুহূর্তে সব বাতিল হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎনির্ভর চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারকারী রোগী ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সংরক্ষণকারী পরিবারগুলোর উদ্বেগ আরও বেড়েছে। শহরের বহু এলাকা অন্ধকারে ডুবে থাকলেও হাসপাতালগুলো জরুরি বিকল্প ব্যবস্থায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিশ্রুতি ভেঙে বাস্তবতার মুখোমুখি : কয়েক মাস আগেও সরকার গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সঞ্চালন লাইন ও বিতরণব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাতীয় গ্রিডের উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং হাজার হাজার স্থাপনা ক্ষতির মুখে পড়েছে।
দীর্ঘদিনের অবহেলা আরও প্রকট : বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে শুধু যুদ্ধ নয়, বহু বছরের বিনিয়োগ ঘাটতি, পুরোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামো, সঞ্চালন ব্যবস্থায় অপচয় এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যর্থতাও সমানভাবে দায়ী। তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই দুর্বলতাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শিল্প উৎপাদনে বড় ধাক্কা : দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কারখানাগুলো নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কা, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে।
নতুন করে হামলা, পাল্টা অভিযানের দাবি : এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রেও উত্তেজনা থামেনি। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। এর জবাবে ইরান বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডানসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। তবে এসব দাবির অনেকগুলোর স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
কেন সরাসরি বড় লক্ষ্যবস্তু এড়িয়ে চলছে ইরান : সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর কিংবা ইসরায়েলের মূল সামরিক স্থাপনায় সরাসরি হামলা থেকে বিরত রয়েছে। তাদের ধারণা, এমন হামলা হলে আরও বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পরিবর্তে আঞ্চলিক স্থাপনা লক্ষ্য করে চাপ তৈরির কৌশল গ্রহণ করেছে তেহরান। অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই কৌশল এখন আগের মতো কার্যকরও নয়।
জ্বালানি পথ ঘিরে নতুন উদ্বেগ : হরমুজ প্রণালি ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং সমুদ্রপথে অবরোধের হুমকিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মার্কিন হতাহত ও যুদ্ধের বিস্তার : চলমান সংঘাতে একাধিক মার্কিন সেনা নিহত ও আহত হওয়ার পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইরানকে কঠোর মূল্য দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানও বিভিন্ন সামরিক অভিযানের দাবি অব্যাহত রেখেছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব : মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে এবং বিভিন্ন দেশে জ্বালানির খুচরা মূল্যেও এর প্রভাব পড়ছে। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া : যুদ্ধ, বিদ্যুৎ সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনাÑ সব মিলিয়ে ইরান বর্তমানে এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। সাধারণ মানুষ প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় এর কঠিন প্রভাব অনুভব করছেন, শিল্প খাত ক্ষতির মুখে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উদ্বেগ বাড়ছে। কূটনৈতিক উদ্যোগের কিছু ইঙ্গিত থাকলেও এখনো স্থায়ী সমাধানের কোনো স্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। ফলে ইরানের পাশাপাশি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যই এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন