একসময় জুয়ার আসর মানেই ছিল নির্দিষ্ট কোনো ক্যাসিনো, ক্লাব বা গোপন আড্ডাখানা। এখন সেই জুয়ার আসর চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনে। একটি ক্লিক, একটি বিজ্ঞাপন কিংবা কোনো তারকার মুখ, এতটুকুই যথেষ্ট একজন মানুষকে অনলাইন জুয়ার অন্ধকার জগতে টেনে নেওয়ার জন্য। ফলে এটি এখন অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতি, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও এক বহুমাত্রিক হুমকি।
দেশে প্রতিদিন অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে। এই বিপুল অর্থ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের হাজারো অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরিত হয়ে ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র, দেশীয় দালাল, ভুয়া সিম, জাল পরিচয়পত্র, মোবাইল ব্যাংকিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ডিজিটাল হুন্ডি, সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ফলে বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এই নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব নয়।
আরও অবাক করা বিষয় হলো, কিছু জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদ, অভিনয়শিল্পী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব অর্থের বিনিময়ে এসব জুয়ার প্ল্যাটফর্মের প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। সমাজে যাদের অনুসরণ করে তরুণ প্রজন্ম, তাদের মাধ্যমে যখন অবৈধ জুয়ার বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা কেবল আইনের লঙ্ঘন নয়, নৈতিক দায়িত্বেরও চরম অবমাননা। আইন যদি জুয়ার প্রচারণাকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে থাকে, তবে বিজ্ঞাপনে অংশ নেওয়া ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোন না কেন, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। আইনের প্রয়োগে বৈষম্য থাকলে অপরাধ কখনোই কমবে না।
অনলাইন জুয়ার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে গ্রামের তরুণ, শিক্ষার্থী এবং নি¤œ আয়ের মানুষ। প্রথমে সামান্য লাভের প্রলোভন, পরে বড় বিনিয়োগ, তারপর সর্বস্বান্ত হওয়ার চক্র, এটাই এখন এই ব্যবসার কৌশল। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, দ্রুত ধনী হওয়ার মানসিকতা এবং ডিজিটাল অজ্ঞতাকে পুঁজি করে অপরাধচক্র তাদের বিস্তার ঘটাচ্ছে। ফলাফল হিসেবে বাড়ছে ঋণগ্রস্ততা, পারিবারিক ভাঙন, আত্মহত্যা, চুরি, ছিনতাই এবং অন্যান্য অপরাধ।
সরকার ইতোমধ্যে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করেছে এবং অনলাইন জুয়া, এর প্রচারণা ও সহায়তাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান, হাজার হাজার এমএফএস অ্যাকাউন্ট জব্দ, সন্দেহজনক লেনদেন স্থগিত এবং সাইবার নজরদারি জোরদার করাও প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গ্রেপ্তার হওয়া অনেক অপরাধী অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন দ্রুত বিচার, কার্যকর শাস্তি এবং অপরাধচক্রের আর্থিক নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস করা।
আমরা মনে করি, এই সংকট মোকাবিলায় একাধিক বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ব্যাংক ও এমএফএস লেনদেন শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং চালু করতে হবে। সেই সঙ্গে, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। তারকা, ইউটিউবার কিংবা ইনফ্লুয়েন্সার যেই অবৈধ জুয়ার প্রচারণা করবেন, তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও অনলাইন জুয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
প্রযুক্তি যেমন মানুষের উন্নয়নের হাতিয়ার, তেমনি অপরাধীদের জন্যও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাও সমানভাবে বাড়াতে হবে। অন্যথায় স্মার্টফোনের পর্দায় শুরু হওয়া এই নেশা ধীরে ধীরে হাজারো পরিবারকে নিঃস্ব করবে, রাষ্ট্র থেকে পাচার হবে বিপুল অর্থ, আর একটি প্রজন্ম হারিয়ে যাবে দ্রুত ধনী হওয়ার মিথ্যা স্বপ্নের অন্ধকারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন