× UCB Sticker Card
রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ০১:৪২ এএম

খাদ্যব্যবস্থা বিপর্যয়ের শঙ্কা

দাবদাহে ধুঁকছে পৃথিবী

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ০১:৪২ এএম

দাবদাহে ধুঁকছে পৃথিবী

বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা তীব্র তাপপ্রবাহ এখন আর কেবল ঋতুভিত্তিক অস্বস্তির বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে মানবসভ্যতার অন্যতম ভিত্তিÑ খাদ্যব্যবস্থাকেই বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কৃষক মাঠে নামতে পারছেন না, গবাদিপশু অসুস্থ হয়ে পড়ছে, ফসলের ফলন কমছেÑ সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য কিন্তু গভীর সংকটের দিকে এগোচ্ছে বিশ^। এই পরিস্থিতিতে শতকোটি মানুষের জীবিকা সরাসরি হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।

সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, পৃথিবীর বহু অঞ্চলে বছরের বড় একটি অংশে তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যে কৃষিকাজ করা নিরাপদ থাকছে না। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এবং লাতিন আমেরিকার বহু এলাকায় কৃষকেরা বছরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময় মাঠে কাজ করতে পারছেন না বা পারলেও তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এতে শুধু উৎপাদন কমছে না, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিও ধাক্কা খাচ্ছে।

মাঠে শ্রম, শরীরে চাপ : তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যায়Ñ এটি বহুদিনের জানা কথা। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তীব্র গরমে কৃষকেরা দীর্ঘ সময় মাঠে থাকতে পারছেন না। সূর্যের প্রখর তাপ, উচ্চ আর্দ্রতা এবং তাপঘাতের ঝুঁকি তাদের জীবনকে প্রতিদিনই বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কাজের সময়সূচি বদলাতে হচ্ছেÑ ভোর বা গভীর রাতে কাজ করতে হচ্ছে, যা সব জায়গায় সম্ভব নয়। শ্রমজীবী মানুষের জন্য এই বাস্তবতা আরও কঠিন। কৃষিশ্রমিক, জেলে, মাঠে কাজ করা নারী ও বয়স্ক মানুষরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। তাদের আয় কমছে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, আর জীবিকা হয়ে উঠছে অনিশ্চিত।

গবাদিপশুতে তাপের প্রভাব : তীব্র তাপপ্রবাহ শুধু মানুষ নয়, গবাদিপশুর ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম তাপমাত্রাতেই তাপজনিত চাপ শুরু হয়। ফলে অতিরিক্ত গরমে তাদের শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। দুগ্ধ গাভীর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, গরম বাড়লে দুধ উৎপাদন কমে যাচ্ছে। শুধু পরিমাণ নয়, দুধের গুণগত মানও কমে যাচ্ছেÑ চর্বি ও প্রোটিনের মাত্রা হ্রাস পাচ্ছে। মুরগি ও শূকরের মতো প্রাণীরা ঘামতে পারে না, ফলে তারা দ্রুত তাপজনিত সমস্যায় পড়ে। তাদের হজম প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, এমনকি মৃত্যুও ঘটে।

ফসলের ফলনে ধস : তাপমাত্রা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফসল উৎপাদনে। অধিকাংশ প্রধান খাদ্যশস্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রার বেশি সহ্য করতে পারে না। তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, কোষের গঠন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে ভুট্টা ও গমের উৎপাদন কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কিছু এলাকায় ভুট্টার ফলন প্রায় দশ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে গমের ক্ষেত্রেও। তাপমাত্রা আরও বাড়লে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সমুদ্রেও তাপের আঘাত : তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু স্থলভাগে সীমাবদ্ধ নয়। সমুদ্রের পানিও দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। এর ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে, যা সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি। মাছের ব্যাপক মৃত্যু ঘটছে, অনেক প্রজাতির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এর ফলে মৎস্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকাও ঝুঁকিতে পড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টিÑ সবই এই সংকটে আক্রান্ত হচ্ছে।

খাদ্যব্যবস্থার ভঙ্গুরতা : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বৈশি^ক খাদ্যব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত কিছু ফসলের ওপর নির্ভরশীল। বৃহৎ পরিসরে এক ফসলি চাষ এবং শিল্পভিত্তিক উৎপাদন পদ্ধতি খাদ্যব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে একসঙ্গে কয়েকটি প্রধান ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব বিশ^জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই নির্ভরশীলতা খাদ্য সরবরাহব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলেছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ, অন্যদিকে উৎপাদন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাÑ সব মিলিয়ে খাদ্যব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

জ্বালানি ও সারের সংকটের প্রভাব : খাদ্য উৎপাদন শুধু আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি জ্বালানি, সার, পরিবহন এবং বৈশি^ক বাণিজ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সারের সরবরাহে বিঘœ সৃষ্টি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। সারের দাম বাড়ছে, কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকেরা সারের ব্যবহার কমাতে বাধ্য হচ্ছেন, যা ফলনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বাড়ায় কৃষিযন্ত্র, সেচ এবং পরিবহন খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া সংকট : খাদ্যসংকট সবসময় হঠাৎ করে দেখা দেয় না। এটি ধীরে ধীরে তৈরি হয়Ñ প্রথমে উৎপাদন কমে, তারপর দাম বাড়ে, এরপর সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। শেষপর্যন্ত মানুষ খাদ্যের মান কমায়, পরে পরিমাণও কমাতে বাধ্য হয়। বর্তমান পরিস্থিতিও সেই পথেই এগোচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাপপ্রবাহ, সারের সংকট, জ্বালানির দাম বৃদ্ধিÑ সব মিলিয়ে একটি জটিল সংকট তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব আগামী মৌসুমগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

অভিযোজনের সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা : তবে এই সংকট পুরোপুরি অনিবার্য নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগাম পূর্বাভাস এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক ক্ষতি কমানো সম্ভব। তাপপ্রবাহ পূর্বাভাসযোগ্য হওয়ায় কৃষকদের আগেই সতর্ক করা যায়। মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। ফসলের ধরন পরিবর্তন, চাষের সময়সূচি বদল, সেচব্যবস্থার উন্নয়নÑ এসব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে কিছুটা ক্ষতি কমানো সম্ভব। তবে অভিযোজনেরও একটি সীমা রয়েছে। তাপমাত্রা যদি লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকে, তা হলে এই ব্যবস্থাগুলোও পর্যাপ্ত হবে না।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজন : বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ মোকাবিলা না করলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি গ্রহণÑ এই পদক্ষেপগুলো জরুরি। একই সঙ্গে খাদ্যব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। এক ফসলি চাষের পরিবর্তে মিশ্র চাষ, গাছপালা ও ছায়া ফিরিয়ে আনা এবং স্থানীয়ভাবে উপযোগী কৃষিপদ্ধতি উন্নয়ন করতে হবে।

নীতিগত উদ্যোগের আহ্বান : শ্রমজীবী মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তীব্র গরমে কাজের সময়সীমা নির্ধারণ, বিশ্রাম, ছায়া ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করাÑ এসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও শ্রমিকদের জন্য আর্থিক সহায়তা, ঋণ মওকুফ এবং অভিযোজন খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও বলা হচ্ছে।

বৈশি^ক প্রভাব : এই সংকট শুধু উষ্ণ অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল এবং উন্নত দেশগুলোকেও এর প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। কারণ খাদ্যব্যবস্থা এখন বৈশি^কভাবে আন্তঃসংযুক্ত। একটি অঞ্চলের উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব অন্য অঞ্চলেও পড়ে। খাদ্যের দাম, সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাÑ সবকিছুই এই পরিবর্তনের ফলে প্রভাবিত হবে।

তীব্র তাপপ্রবাহ এখন বৈশি^ক খাদ্যব্যবস্থার জন্য এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী হুমকি হয়ে উঠেছে। এটি শুধু ফসল বা পশুপালনের সমস্যা নয়; এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন। সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে এই সংকট আরও গভীর হবে এবং এর প্রভাব বহন করতে হবে পুরো বিশ^কে। এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, দ্রুত পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিÑ যাতে পৃথিবীর খাদ্যব্যবস্থা আবার স্থিতিশীল ও সহনশীল হয়ে উঠতে পারে।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!