ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

হরমুজ সংকটে বিশ্ব উদ্বিগ্ন 

অনিশ্চয়তার পথে শান্তির আলো

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ০৫:৫৬ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন সামরিক হুমকির জবাবে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। একই সময়ে সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি সম্ভাব্য পথও উন্মুক্ত হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি হুমকি দেন, আমরা পদক্ষেপ নিই।’ তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি কোনো বিদেশি শক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি ইরানের সার্বভৌম জলসীমার অংশ এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইরানের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর। এই বক্তব্য আসে এমন এক সময়, যখন ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেবে এবং প্রয়োজনে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেবে।

ট্রাম্পের কড়া ভাষা, ইরানের কঠোর প্রতিক্রিয়া : ফক্স নিউজকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি সরাসরি ইরানি কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছেন। তার ভাষায়, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে, তবে দেশটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র ওই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে এবং সেখানে নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার থেকে সরে আসবে না বলে মন্তব্য করার পর ট্রাম্প আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, তেহরানের নেতৃত্বকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হবে, অন্যথায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
লেবানন সংকট থেকে নতুন উত্তেজনা : হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পেছনে লেবাননের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার প্রতিবাদে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সম্প্রতি ঘোষণা দেয় যে প্রণালিটি আবারও বন্ধ করা হয়েছে। 

সুইজারল্যান্ডে দীর্ঘ বৈঠক, শান্তির নতুন রূপরেখা : উত্তেজনার মধ্যেও সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টাব্যাপী এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অংশ নেয় পাকিস্তান ও কাতার। বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, উভয়পক্ষ আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে। 

হরমুজে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিতের উদ্যোগ : বিশ^ অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশে^র উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও তরলীকৃত গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক উত্তেজনার ফলে নৌযান চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিভিন্ন সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক নিচে নেমে এসেছে। 

পারমাণবিক ইস্যুতে এখনো দূরত্ব : যদিও শান্তি আলোচনায় কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো ভিন্ন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পারমাণবিক বিষয়টি নিয়ে কেবল সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে। বিস্তারিত আলোচনায় এখনো প্রবেশ করা হয়নি। তেহরানের অবস্থান হলো, তারা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার ত্যাগ করবে না। 

নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আশায় ইরান : সুইজারল্যান্ডের আলোচনায় ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং বিদেশে আটকে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদ মুক্ত করা। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তেল ও পেট্রোরাসায়নিক পণ্যের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে জব্দ করা কিছু আর্থিক সম্পদ অবমুক্ত করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

বিশ^বাজারে তেলের দাম কমেছে : শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম কয়েক মাসের মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে আসে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা এবং হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা ফেরার আশা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে।

পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় আশাবাদ : বর্তমান আলোচনায় পাকিস্তান ও কাতার গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, বৈঠকটি ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এতে উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতি হয়েছে।

চীনের সমর্থন : আলোচনা শেষ হওয়ার পর চীনও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বেইজিং আশা প্রকাশ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বর্তমান সংলাপের ধারা বজায় রাখবে এবং একটি স্থায়ী সমঝোতার দিকে এগিয়ে যাবে। 

অনিশ্চয়তার মধ্যেও শান্তির সম্ভাবনা : হরমুজ প্রণালি, লেবানন সংকট, পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাÑ সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক এখনো গভীর অবিশ্বাসে আচ্ছন্ন। ট্রাম্পের কঠোর হুমকি এবং ইরানের পাল্টা অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। তবে একই সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের আলোচনায় ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে যে রূপরেখা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘদিনের বৈরিতার মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এখন নজর থাকবে আসন্ন কারিগরি আলোচনার দিকে। কারণ সেখানেই নির্ধারিত হবে মধ্যপ্রাচ্য নতুন সংঘাতের দিকে এগোবে, নাকি বহু প্রতীক্ষিত শান্তির পথে যাত্রা শুরু করবে।