ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

সম্পাদকীয়

ওষুধের বাজারে নৈরাজ্য বন্ধ করুন

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ০৬:০৯ এএম

মানুষ যখন অসুস্থ হয়, তখন তার শেষ ভরসার জায়গা চিকিৎসা এবং ওষুধ। কিন্তু সেই ওষুধই যদি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তবে তা কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং একটি গভীর মানবিক সংকটের জন্ম দেয়। বাংলাদেশে বর্তমানে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী ওষুধের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যাদের আয়ের বড় একটি অংশ চিকিৎসা ব্যয়ে ব্যয় হয়, তারা আজ ওষুধ কিনতে গিয়ে নীরবে নিঃস্ব হচ্ছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকার একদিকে ওষুধ শিল্পের বিকাশে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট ছাড়ের ঘোষণা দিচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে তার কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং ক্যানসার, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা জ্বর-সর্দির মতো সাধারণ রোগের ওষুধের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে।

ওষুধ শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম সফল খাত। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করে এই শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারেও সুনাম অর্জন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি উৎপাদন ব্যয় কমাতে সরকার এত বড় কর-সুবিধা দেয়, তাহলে সেই সুবিধা কেন সাধারণ রোগীর কাছে পৌঁছাচ্ছে না? বাজারে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ডলারের উচ্চমূল্য, কাঁচামাল আমদানির খরচ এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব থাকলেও, এর সঙ্গে একচেটিয়া বাজারব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং দুর্বল বাজার তদারকির বিষয়টিও সমানভাবে জড়িত।

দুঃখজনক হলেও সত্য, ওষুধের বাজারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ এখন অনেকটাই দুর্বল। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ বিক্রি হচ্ছে, অথচ কার্যকর তদারকি চোখে পড়ছে না। এতে একদিকে যেমন রোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে সৎ ব্যবসায়ীরাও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাজারে একটি অস্বচ্ছ ও অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার মাশুল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।

আমরা মনে করি, ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ও বাজার তদারকির ক্ষেত্রে সরকারকে আরও কঠোর ও দ্রুত কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করতে হবে, নিয়মিত বাজার মনিটরিং বাড়াতে হবে এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ বিক্রি করলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কর-সুবিধার সুফল যেন সরাসরি রোগীদের কাছে পৌঁছে, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা ও মানবিকতার অন্যতম মানদ- হলো, তার নাগরিকরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ কতটা সহজে পায়। মানুষ যখন খাবারের খরচ কমিয়ে ওষুধ কিনতে বাধ্য হয়, তখন তা শুধু একটি অর্থনৈতিক সংকটের চিত্র নয়, বরং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতারও প্রতিচ্ছবি। এই বাস্তবতা বদলাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ, ওষুধের বাজারে অস্থিরতা মানে শুধু মূল্যবৃদ্ধি নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ওষুধ কোনো বিলাসপণ্য নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম মৌলিক অনুষঙ্গ। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের জন্য ন্যায্যমূল্যে নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধ নিশ্চিত করতে পারে না, সে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সব পরিসংখ্যানই একসময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আজ একজন রোগী যখন খাবারের খরচ কমিয়ে ওষুধ কিনতে বাধ্য হন, কিংবা প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম শুনে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়Ñ এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারও প্রতীক। তাই ওষুধের বাজারকে কিছু কোম্পানি বা মধ্যস্বত্বভোগীর মুনাফার খেলার মাঠে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।

আমরা আশা করব, সরকার এখনই কঠোর নজরদারি, কার্যকর মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিমূলক বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার নাগালে রাখবে। কারণ, ওষুধের দাম যদি মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তবে শুধু রোগীর জীবনই নয়, রাষ্ট্রের মানবিক চরিত্রও বিপন্ন হয়ে পড়ে।