বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন সামনে রেখে চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) প্রাঙ্গণে বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ এবং আনাগোনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ এই কেপিআই ভুক্ত এলাকায় প্রতিদিন শত শত অপরিচিত মানুষের ভিড় জমায় চলচ্চিত্রের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘিœত হচ্ছে বলে অভিযোগ। এর ফলে মূল ফটকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি তারকা ও সংশ্লিষ্ট কলাকুশলীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনে এফডিসিতে সরেজমিনে দেখা যায়, অসংখ্য অপরিচিত মুখ। কেউ এসেছেন এফডিসি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। আবার কেউবা এসেছেন নির্বাচনের কথা শুনে তারকা দেখার বাসনা থেকে। যে কারণে এফডিসিতে যে দিকে চোখ যায় সেদিকেই দেখা মিলে অপরিচিত মানুষের। তারকাদের দেখার হিড়িকে শুটিং স্পট যখন বিনোদন পার্ক!
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সিনেমা বা নাটকের শুটিং এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাজ ছাড়া শুধু তারকাদের একনজর দেখতে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরির উদ্দেশ্যে অনেকেই এখন এফডিসিতে ভিড় করছেন। এই অবাধ বিচরণের কারণে সম্প্রতি এফডিসির ভেতরে চুরি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটেছে। গত মে মাসে এফডিসির ডাবিং রুম থেকে চিত্রনায়িকা তানহা তাসনিয়ার ব্যক্তিগত মুঠোফোন চুরির ঘটনা ঘটে, যা প্রশাসনের নজরদারি ও প্রবেশপথের পাহারার দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনেছে।
এফডিসিতে প্রতিদিনই বিভিন্ন চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, নাটকের শুটিং হচ্ছে। সেখানে শত শত শিল্পী, কলাকুশলীরা অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া সেখানে রয়েছে চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও শিল্পী সমিতিসহ বেশ কিছু সংগঠনের অফিস। প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এ অঙ্গনের মানুষেরা। এর কারণ হিসেবে ঘটে যাওয়া কয়েকটি চুরি ঘটনার কথা জানা যাচ্ছে।
গত ১৫ মে চিত্রনায়িকা তানহা তাসনিয়া ইসলামের আইফোন চুরির ঘটনা ঘটেছে। তার ভাষ্যে, এফডিসির সাউন্ড কমপ্লেক্সে নির্মাতা গাজী মাহবুব পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্র ‘অস্তিত্বের লড়াই’-এর ডাবিংয়ে অংশ নেন তিনি। ডাবিং চলাকালে সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৭টা ১৫ মিনিটের মধ্যে এক ব্যক্তি নিজেকে চিত্রনায়ক জয় চৌধুরীর ড্রাইভার পরিচয় দিয়ে সেখানে অবস্থান নেয়। পরে সে কৌশলে ডাবিং রুমে প্রবেশ করে অভিনেত্রীর কমলা রঙের আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তি ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করেছিল।
তানহা বলেন, ‘এ ঘটনার পর থানায় জিডি করেছিলাম। পুলিশ আমাদের কাছে সিসিটিভির ফুটেজ চেয়েছিল। এফডিসি কর্তৃপক্ষ কোন ফুটেজ দিতে পারে নাই। ঘটনার দিনের দুপুর ১২টা পর্যন্ত ফুটেজ আছে। এর পরের ফুটেজ নেই। ২৮টি ক্যামেরার মধ্যে অধিকাংশই নষ্ট। এরকম হলে কীভাবে হবে।’
তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে সার্ভার অচল থাকায় ক্যামেরাগুলো কার্যকর নয়। একটি কেপিআইভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতিকে তিনি উদ্বেগজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেন।
এ ধরনের ঘটনা এফডিসিতে নতুন নয়। ২০২২ সালে অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাসের ব্যাগ ও দুটি মোবাইল ফোন চুরি হয়। ২০২৩ সালে শুটিং সেট থেকে তাসনিয়া ফারিণের আইফোন ১৪ প্রো চুরি যায়। তার আগে চিত্রনায়িকা শাহনূরের ফোন চুরি হয়েছে বলে তিনি জানান। এছাড়া ২০২৪ সালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং ২০২৫ সালে প্রশাসনিক ভবনে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে এফডিসিতে।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ, অকার্যকর নিরাপত্তা ও নজরদারির অভাবে বারবার এমন ঘটনা ঘটলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অথচ এফডিসির প্রবেশ গেটে পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত বলে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্যামেরাই অচল বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ শিল্পী বলেন, ‘এখন এফডিসিতে গেলে আতঙ্কে থাকতে হয়। চুরি ও হামলার মতো ঘটনা ঘটলেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। যে কারণে যতটা সম্ভব এফডিসি এড়িয়ে চলি। একাধিকবার এফডিসিতে চুরির ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বাস্তবে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। খেয়াল খুশি মতো যখন-তখন যে কেউ এফডিসিতে প্রবেশ করছে। নিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই।’
এক আলাপে তারকা দম্পতি নাঈম-শাবনাজ জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে আমন্ত্রণ পেলেও তারা এখন আর এফডিসিতে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তাদের অভিযোগ, ইউটিউবারদের অনিয়ন্ত্রিত ভিডিও ধারণ ও বিভ্রান্তিকর প্রচারের আশঙ্কায় শিল্পীরা বিব্রত হন। পাশাপাশি চুরি ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে এফডিসির নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানান তারা। একই কথা বলেছেন চিত্রনায়ক বাপ্পারাজও।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তানি এসব ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ঘটনাগুলো দুঃখজনক। বেশিরভাগ ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা যেটা জানতে পেরেছি যারা চুরির সঙ্গে যুক্ত তারা শুটিং ইউনিটের সঙ্গে ইউনিটের লোক পরিচয়ে এসেছিল। আমরা ঘটনাগুলোর পর সিসি ক্যামেরা, সার্ভার দু-একটা ছাড়া এখন মোটামুটি ঠিক করেছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘তেজগাঁওয়ে আমাদের এখানে ৭.৬৩ একর জায়গা রয়েছে। এখানে বর্তমানে ৯টি শুটিং ফ্লোরের মধ্যে ৬টি চালু রয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল ভবন, সাউন্ড কমপ্লেক্স, অফিস ভবনসহ অনেক স্থাপনা রয়েছে। এত বড় স্থাপনার জন্য আমাদের নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন ৮জন। এর মধ্যে এখানে কাজ করে ৭ জন।’
বর্তমান নিরাপত্তাকর্মীরা ১২ ঘণ্টার দুটি শিফটে কাজ করেন। যার কারণে নিরাপত্তার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলে স্বীকার করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি জানান, নিরাপত্তা জোরদার জন্য ৭ জন নিরাপত্তাকর্মী, ৭ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী আউটসোর্সিং করার জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। এরপর নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা আর থাকবে না, বলে আশা ব্যক্ত করেছেন তানি।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, শিল্পী সমিতির নির্বাচন বা বিভিন্ন উৎসবের সময়ে এই ভিড় বহুগুণ বেড়ে যায়। সাধারণ ভোটার ও প্রার্থীরা ঠিকমতো নির্বাচনি কাজ করতে পারেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিনয়শিল্পী জানান, ‘এফডিসি আমাদের কাজের জায়গা, কিন্তু এখন এখানে ঢুকলে চেনা মুখের চেয়ে অচেনা মানুষই বেশি দেখা যায়। নিরাপত্তার অভাবে আমরা সবসময় তটস্থ থাকি।’
চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষের দাবি, এফডিসির সুবর্ণ অতীত ও কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বহিরাগতদের প্রবেশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রধান প্রবেশদ্বারে ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

