ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর : বিশ্বমঞ্চে বহুমাত্রিক সমীকরণ

সালমান ফরিদ, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ০৬:১১ এএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন বেইজিং সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আঞ্চলিক ভূকৌশলগত প্রেক্ষাপটে বহুমাত্রিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এমন কি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আঞ্চলিক সমীকরণ ছাপিয়ে বিশ্বমঞ্চ প্রভাবিত করছে। অন্তত এশিয়ার এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তো বটেই! এর পেছনে বেশকিছু কার্যকারণ রয়েছে; আজকের আলোচনায় আমরা তা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।

একটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তার পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ কেমন হবে এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতার মঞ্চে দেশটি কীভাবে নিজের ভারসাম্য বজায় রাখবে, তা নির্ধারিত হয় মূলত শীর্ষ নেতৃত্বের প্রথম দিককার বিদেশ সফরগুলোর মধ্যদিয়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই আসন্ন সফরটি কেবল একটি সাধারণ দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক যাত্রা নয়, বরং এটি ভূরাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌম অস্তিত্ব ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে আন্তর্জাতিক দরবারে সগৌরবে জানান দেওয়ার কৌশলী মহড়া।

তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রীর এ গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সফরটি যতই ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ততই এক ধরনের পরিকল্পিত অস্থিরতা, জলঘোলা করার অপচেষ্টা এবং নানামুখী দেশি-বিদেশি চক্রান্তের জাল সুনিপুণভাবে বিছানোর দৃশ্য সামনে আসতে দেখা যাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এ ঘটনাগুলোকে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সম্পূর্ণ আলাদা প্ল্যাটফর্মের মনে হলেও, একটু গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার বোঝা যায়, এগুলো সব আসলে একই সুতোয় গাঁথা এবং এর পেছনে একটি সুগভীর আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনৈতিক কার্যকারণ সক্রিয় রয়েছে, যার কেন্দ্রে আছে প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে দুই পরাশক্তি ভারত ও চীনের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের নেওয়া কূটনৈতিক ‘মাস্টারস্ট্রোক’।

নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই কূটনৈতিক পাড়া থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনে গভীর কৌতূহল ছিলÑ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরটি কোন পরাশক্তিতে হচ্ছে, ভারতে নাকি চীনে? দেশের তীব্র ডলার সংকট ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের এই ক্রান্তিকালে বেইজিংয়ের বিপুল উদ্বৃত্ত অর্থ ও মেগা প্রজেক্টের লোভনীয় প্রস্তাবের কারণে অনেকে ভাবছিলেন প্রথম সফরটি চীনে হওয়াই রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ। কিন্তু কূটনীতির চাল যারা বোঝেন, তারা জানেন আবেগের ওপর ভিত্তি করে টেকসই পররাষ্ট্রনীতি হয় না; অতীত ইতিহাস ও অতি সম্প্রতি বিগত লীগ সরকারের পতন পর্যন্ত বেইজিংয়ের একতরফা ভূমিকা দেশের মানুষের মনে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে রেখেছিল। তদুপরি, চীন মূলত একটি ‘ব্যবসায়ী রাষ্ট্র’, যেখানে লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ থাকে তারা স্বার্থের প্রয়োজনে নিজে এগিয়ে আসে, ফলে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের মতো একটি উচ্চ-কৌশলগত ইভেন্ট বেইজিংয়ের পেছনে আগাম উৎসর্গ করার কোনো বাস্তব প্রয়োজন ছিল না। অন্যদিকে, প্রথম সফরটি যদি দিল্লিতে হতো, তবে তা দেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘ দেড়-দুই দশক ধরে গড়ে ওঠা তীব্র ও চরম আকারের ভারতবিরোধী জনমত ও সেন্টিমেন্টকে মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ করত। বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বেইজিং ও দিল্লির দ্বিমুখী টানাপোড়েন এবং ২০২৬ সালের ফারাক্কা চুক্তির ৩০ বছর মেয়াদি অত্যন্ত সংবেদনশীল চুক্তি নবায়নের এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে, চীনের আগে ভারত সফর করা কিংবা ভারতের আগে চীন সফর করা। উভয় সিদ্ধান্তই বাংলাদেশকে যেকোনো এক পক্ষের প্রকাশ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিত, যা সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলত।

এই দুই পরাশক্তির মরণজট, তীব্র মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্র এড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার সরকার যে কৌশলটি নিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে নিখুঁত ভারসাম্য। পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন থেকে বিদেশ সফরে কোনো বাহ্যিক চাপ বা প্রত্যাশার কারণে নয়, বরং সম্পূর্ণ নিজস্বভাবে এবং দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়া ও জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেবে। সরকার বর্তমানে একটি পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যেখানে বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে বাস্তব প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। এই বাস্তবমুখী দর্শনের অংশ হিসেবেই প্রধানমন্ত্রী প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে ভারত কিংবা চীনÑ কোনো পরাশক্তির আঙিনাকে বেছে না নিয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ একটি ‘থার্ড কান্ট্রি’ তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে এই সফরটি নির্ধারণ করার মূল কারণ হলো, দেশের প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শ্রমবাজারে সহযোগিতা এবং রেমিট্যান্সের মূল চালিকাশক্তি তথা ঝিমিয়ে পড়া শ্রমবাজারের জটিলতা নিরসন করা ও বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি করা। এটি দিল্লির রাজনৈতিক সমীকরণ বা বেইজিংয়ের মেগা প্রজেক্টের মোহের চেয়ে বর্তমান সংকটে অনেক বেশি জরুরি। তবে এই কৌশলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও জাদুকরী দিক হলো এর সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা; এই সরকারি সফরে রোববার বিকেলে কুয়ালালামপুরে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী। ২৩ জুন সোমবার বিকেলে কুয়ালালামপুর থেকে সরাসরি চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের ডালিয়ানের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। প্রথমে একটি নিরপেক্ষ ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রে গিয়ে নিজের সার্বভৌম অবস্থান ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি স্পষ্ট করার কারণে যেমন প্রচ্ছন্নভাবে চীনের আগে ভারতকে সফর না করার বিতর্কটি এড়ানো গেছে, তেমনি বেইজিংয়ের ঠিক পরমুহূর্তের সফরটি বিশ্বকে এই বার্তাই দেয় যে, বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের অংশ নয়। এই কারণেই পরাশক্তিগুলোর ভূকৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে এখন ভারতবিরোধী স্লোগান, ধর্মীয় বিভাজনের উসকানি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা চলছে, যাতে বাংলাদেশ চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রটিকে পুরোপুরি নিজের পক্ষে নিয়ে কূটনৈতিক চাল চালতে না পারে। কিন্তু বর্তমান সরকারের ঝানু ও পেশাদার কূটনৈতিক দল বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে তিস্তা মহাপরিকল্পনার চীনা কার্ডটিকে ভারতের কাছ থেকে পানি আদায়ের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসেবে ব্যবহার করতে যাচ্ছে, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন দিল্লির চিরাচরিত অজুহাত দেওয়ার পথও বন্ধ করে দিয়েছে।

এই সুনির্দিষ্ট সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ২৩-২৫ জুন চীনের ডালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’ প্রতিপাদ্যে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেবেন, যেখানে ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের ১ হাজার ৭০০-এর বেশি প্রতিনিধি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবণতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করবেন। এরপর ২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে বেইজিংয়ে দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং পরবর্তী দিন অর্থাৎ ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এ সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদার, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে অবকাঠামো, প্রযুক্তি, সংযোগ এবং উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং অনুযায়ী, এই আসন্ন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মোট ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সই হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং একটি প্রটোকল রয়েছে। একই সঙ্গে বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েও এই সফরে আলোচনা হবে। তবে এই তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নের প্রস্তাব প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত বিচক্ষণ; ইতিপূর্বে হওয়া ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা সমীক্ষাটি সরকার ইতোমধ্যে পুনর্বিবেচনা করেছে এবং ‘রিজার্ভার ও ড্যামেজ সাইজ’ সংক্রান্ত কারিগরি ও পরিবেশগত বিষয়গুলো পুরোপুরি স্পষ্ট হওয়ার পরেই এই নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা অগ্রসর হবে। সবশেষে সফর শেষ করে আগামী শুক্রবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা। ফলে অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তীর মতো ব্যক্তিদের মাধ্যমে যে ধরনের সীমান্ত উত্তেজনা, বিচ্ছিন্নতাবাদের উসকানি, ধর্মীয় বিভাজনের ফাঁদ কিংবা আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে, তা দেশের সচেতন জনগণ এবং বর্তমান সরকারের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কাছে ধূলিসাৎ হতে বাধ্য।

এই সমস্ত সুগভীর ষড়যন্ত্র ও বিরোধের মূল কার্যকারণকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে, আবেগ ও উসকানির স্রোতে গা না ভাসিয়ে, দেশের প্রকৃত বন্ধু ও শত্রুকে চিনে নিয়ে বর্তমান সময়ে আমাদের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সচেতনতা দেখাতে হবে। যাতে আসন্ন চীন সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ কোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক শক্তির দাবার ঘুঁটি না হয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং অক্ষুণœ সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে এক নতুন, শক্তিশালী ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।