ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

প্রকৃতির ভারসাম্য ভাঙছে মানুষের কর্মকাণ্ডে 

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৬:৪১ এএম

বিশ্বজুড়ে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং যেন নতুন বাস্তবতা। কোথাও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, কোথাও দাবানল, কোথাও শক্তিশালী টাইফুন, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যাÑ প্রকৃতি যেন ক্রমেই আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিবর্তনের পেছনে শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, মানুষের দীর্ঘদিনের পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকা-ও বড় ভূমিকা রাখছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট : বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বনভূমি ধ্বংস, শিল্প-কারখানার দূষণ এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। এর প্রভাবে বায়ুম-লের স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহের ধরন বদলে যাচ্ছে। জেট স্ট্রিম ও রসবি তরঙ্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ বায়ুপ্রবাহে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি, খরা ও ভয়াবহ ঝড়ের মতো দুর্যোগ আরও ঘন ঘন ঘটছে। ফলে ঋতুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যও ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপে তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ভয়াবহতা : ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এ বছর নজিরবিহীন তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস, বেলজিয়াম এবং যুক্তরাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপমাত্রা অতীতের বহু রেকর্ড ভেঙেছে। ফ্রান্সের রাজধানীর কাছাকাছি ঐতিহাসিক বনাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানলে শত শত হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে। বহু পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিম ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহে হাজার হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে প্রবীণ, হৃদরোগী ও শ^াসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। গবেষকদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন না হলে এত তীব্র তাপপ্রবাহ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম ছিল।

এশিয়ায় টাইফুন, বন্যা ও ভূমিধস : এদিকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশও একের পর এক দুর্যোগে বিপর্যস্ত। শক্তিশালী টাইফুনের আঘাতে চীনের পূর্বাঞ্চল, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও জাপানের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। লাখ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঝড়ো হাওয়া, ভারি বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তরাখ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে অতিবৃষ্টি, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। কোথাও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, কোথাও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ভারি বর্ষণের কারণে শিল্প-কারখানাতেও দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

সুপার এল নিনোর নতুন শঙ্কা : আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পৃথিবী শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। এই পরিস্থিতি আরও তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বৈশি^ক আবহাওয়ার ভারসাম্য আরও অস্থির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিবেশ ধ্বংসের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য : বিশে^র বনভূমি দ্রুত কমে যাওয়ায় প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বন উজাড় হওয়ায় বৃষ্টিপাতের ধরন, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে নদী, সমুদ্র ও বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। বনভূমির পরিমাণ কমে যাওয়া, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, বায়ুদূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চল ক্রমেই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দুর্যোগের সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে : জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গত কয়েক দশকে বিশ্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যা, তাপপ্রবাহ, ঝড়, খরা এবং দাবানলের মতো দুর্যোগ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ঘন ঘন ঘটছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এই দশকের শেষ নাগাদ বিশে^ বছরে কয়েক শতাধিক বড় দুর্যোগ ঘটতে পারে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। সীমিত অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্যোগ মোকাবিলার অক্ষমতার কারণে এসব দেশে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

ভবিষ্যতের জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি : বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দুর্যোগের সময় উদ্ধারকাজ পরিচালনা করলেই হবে না; বরং পরিবেশ সংরক্ষণ, বনভূমি রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। পাশাপাশি আগাম সতর্কবার্তা, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতি বারবার সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। সেই সংকেত উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ দুর্যোগ, খাদ্যসংকট, পানিসংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং জলবায়ু উদ্বাস্তু বৃদ্ধির মতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে বিশ^বাসী। তাই পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রÑ সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।