ঢাকা রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬

স্মৃতির টানে শৈশবের আঙিনায়

আবু সুফিয়ান সরকার শুভ
প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২৬, ০৬:২১ এএম

মানুষের জীবনের সবচেয়ে নির্মল, নির্ভেজাল ও রঙিন অধ্যায়ের নাম শৈশব। আর সেই শৈশবের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়। জীবনের প্রথম বর্ণ পরিচয়, প্রথম বইয়ের গন্ধ, প্রথম বন্ধুত্ব, প্রথম স্বপ্ন দেখাÑ সবকিছুর সূচনা ঘটে এখানেই। সময়ের স্রোতে মানুষ যখন জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তখনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্মৃতি হৃদয়ের গভীরে অমলিন হয়ে থাকে। শিক্ষকের হাতে ধরা এক টুকরো চক আর ব্ল্যাকবোর্ডে আঁকা অক্ষরগুলোই যেন একদিন ভবিষ্যতের পথরেখা নির্মাণ করে দেয়।

গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম রায়তী নড়াইলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রায়তী নড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি আজ অর্ধশতক অতিক্রম করে ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ে পদার্পণ করেছে। প্রতিষ্ঠার পর নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার কারণে বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হতে সময় লেগেছিল। অবশেষে ১৯৯০ সালে চারজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের হাত ধরে শুরু হয় এর আনুষ্ঠানিক পথচলা।

সেই সময় বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ছিল সীমিত, সুযোগসুবিধা ছিল অপ্রতুল, কিন্তু ছিল একদল স্বপ্নবাজ মানুষের অদম্য প্রত্যয়। এলাকার শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি, অভিভাবক ও সচেতন জনগণের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথমে রেজিস্টার্ড বিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে বিদ্যালয়টি নতুন গতিতে এগিয়ে চলে।

রায়তী নড়াইল গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। শুরুতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান পরিচালিত হলেও বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাও সংযুক্ত হয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন, নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের সাফল্যের কারণে বিদ্যালয়টি উপজেলায় একটি বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। প্রতিবছর সাধারণ ও ট্যালেন্টপুলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর বৃত্তি অর্জন বিদ্যালয়টির সাফল্যের উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে। বর্তমানে ৯ জন শিক্ষক নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অর্ধশতকের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বয়স বৃদ্ধির ইতিহাস নয়; এটি একটি জনপদের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সফলতার কাহিনি। যে স্বপ্ন নিয়ে ৫০ বছর আগে বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা একটি সুবিশাল বটবৃক্ষের রূপ নিয়েছে। সেই বটবৃক্ষের ছায়ায় বেড়ে উঠেছে হাজারো শিক্ষার্থী, যারা আজ দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

মাটির ঘর থেকে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী থেকে শত শত শিক্ষার্থীর প্রাণচঞ্চল পদচারণাÑ সবকিছুই বিদ্যালয়টির অবিরাম অগ্রযাত্রার সাক্ষ্য বহন করে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশের উন্নয়ন ঘটেছে, কিন্তু অপরিবর্তিত রয়েছে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার সেই মূল চেতনা।

প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাছে এই বিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি তাদের শৈশবের সবচেয়ে প্রিয় আশ্রয়স্থল। সকালের সমাবেশ, জাতীয় সংগীতের সুর, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, শিক্ষকদের স্নেহমাখা শাসন, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানÑ সবকিছুই আজ স্মৃতির পাতায় অমূল্য সম্পদ হয়ে রয়ে গেছে।

কবি জীবনানন্দ দাশের অমর পঙ্ক্তিÑ

‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরেÑ

এই বাংলায়।’

এই পঙ্ক্তির মতোই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও বারবার ফিরে আসতে চান তাদের শৈশবের এই প্রিয় ঠিকানায়। কারণ এই বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি গাছ যেন তাদের জীবনের গল্পের অংশ হয়ে আছে। রায়তী নড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেনি; এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিকতা, দেশপ্রেম, শৃঙ্খলাবোধ, সততা এবং নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ ছিলেন শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক। তাদের নিষ্ঠা, ত্যাগ এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই প্রতিষ্ঠানটি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।

বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনেকেই বর্তমানে শিক্ষক, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা, সমাজসেবক এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় প্রতিষ্ঠিত। তাদের অর্জনের পেছনে এই বিদ্যালয়ের ভিত্তিমূলক শিক্ষার অবদান গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

অর্ধশতকের এই গৌরবময় উপলক্ষকে স্মরণীয় করে রাখতে আয়োজিত হয় সুবর্ণজয়ন্তী ও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। দিনব্যাপী এই আয়োজন পরিণত হয় প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শুভানুধ্যায়ীদের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়। দীর্ঘদিন পর একে অপরের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম লেবু ম-ল এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক অধ্যাপক ড. ময়নুল হাসান সাদিক। সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য লেবু ম-ল।

অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আ.ন.ম. মমিনুল ইসলাম সরকার শামীম বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি শ্রেণিকক্ষ সংকট, শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ওয়াশরুমের অভাব, খেলার মাঠের সীমাবদ্ধতা এবং অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্রামাগারের প্রয়োজনীয়তার বিষয় উল্লেখ করেন। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন।

সহকারী শিক্ষক মানিক সরকার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বিদ্যালয়ের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরেন। নিজের হাতে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটির উত্থান-পতনের নানা ঘটনা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তার বক্তব্যে উঠে আসে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকাশের পেছনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনগণের নিরলস অবদানের কথা।

দিনের শেষ প্রহরে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, কবিতা ও স্মৃতিচারণে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। হাসি, আনন্দ, আবেগ আর ভালোবাসার এক অপূর্ব সমন্বয়ে সবাই যেন ফিরে গিয়েছিলেন তাদের শৈশবের সেই সোনালি দিনগুলোতে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেনÑ

‘শিক্ষার ফল মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্বের বিকাশ।’

রায়তী নড়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধশত বছরের পথচলা সেই মনুষ্যত্ব বিকাশেরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ৫০ বছরের এই গৌরবগাথা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়; এটি একটি জনপদের জাগরণ, একটি গ্রামের স্বপ্নপূরণ এবং আগামী দিনের আরও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার।

অর্ধশতকের এই অর্জন নতুন প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাক, বিদ্যালয়টি আগামী দিনেও জ্ঞান, মানবতা ও আদর্শের বাতিঘর হয়ে পথ দেখাকÑ এই প্রত্যাশাই সকলের।