ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এবিবি

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৬:৫৮ এএম

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। সংগঠনটি মনে করে, দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ সময়োপযোগী ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। গতকাল সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এবিবির চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন এ মন্তব্য করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি রাজনৈতিক মাত্রা পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এবিবি গত ১০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তখন সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বিষয়টির দ্রুত সমাধান ব্যাংকিং খাতের জন্য ইতিবাচক হবে। কারণ ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, এর প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর পড়ছে।

মাসরুর আরেফিন বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সংকট সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ সিদ্ধান্তকে এবিবি ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ইসলামী ব্যাংকের চলমান অস্থিরতা প্রশমিত হবে এবং ব্যাংকটির আমানতকারী, বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের মধ্যে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক, বিপুল পরিমাণ আমানত ও বিনিয়োগ, দেশের অন্যতম বৃহৎ রেমিট্যান্স নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। এবিবির চেয়ারম্যান বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকটির পরিচালনাব্যবস্থা, তারল্য, আমানতকারীদের আস্থা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্যাংকারদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলে সেই উদ্বেগ অনেকটাই দূর হবে বলে তারা বিশ্বাস করেন। সংগঠনটি ইসলামী ব্যাংকে সুশাসন, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর অগ্রগতি প্রত্যাশা করেছে। একই সঙ্গে এবিবি সতর্ক করে বলেছে, ব্যাংক খাতকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির ঘটনা পুরো আর্থিক খাতের জন্য অশনিসংকেত হতে পারে। তাই ব্যাংকিংব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের আর্থিক খাতের স্বার্থে জনগণের আস্থা অক্ষুণœ রাখা এবং ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক ও অনাকাক্সিক্ষত প্রভাবমুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি। এবিবি আশা করছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক উদ্যোগ ইসলামী ব্যাংকসহ সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আরও ২৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ধার পেল ইসলামী ব্যাংক

তারল্যসংকটসহ নানা সমস্যা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আরও ২৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ধার হিসেবে পেল তুমুল আলোচনায় থাকা ইসলামী ব্যাংক। সোমবার এই বিশেষ ধার দেওয়া হয়েছে। এদিকে ইসলামী ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের গণহারে টাকা উত্তোলনের চাপ কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হুসাইন। অন্যদিকে এদিন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন।

দায়িত্ব নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘এখন পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই।’ আমানতকারীদের নির্বিঘেœ লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখার অনুরোধ করেছেন।

জহির হোসেন জানান, যোগ্য ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনে যাচাই-বাছাই চলছে। ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এ ব্রিফিংয়ের সময় ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ইসলামী ব্যাংকে পর্ষদ গঠন বিষয়ে মোহাম্মদ জহির হোসেন জানান, পাঁচ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, আমরা এখানে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ লোক দিতে চাই, যারা এই ব্যাংকটিকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবেন। আশা করি, খুব শিগগির আপনারা একটি সুন্দর ও নিরপেক্ষ বোর্ড পাবেন। তিনি সীমিত সময়ের জন্য এক সদস্যবিশিষ্ট বোর্ডের দায়িত্ব পালন করছেন, যাতে ব্যাংকের কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘœ না ঘটে।

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হুসাইন জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা হিসেবে আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পেয়েছে ব্যাংকটি। তিনি বলেন, গতকালও আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পেয়েছি। সেই অর্থের পুরোটা এখনো ব্যবহার করতে হয়নি। আশা করি, যারা আতঙ্কে টাকা তুলে নিয়েছেন, তারা আবারও ব্যাংকের ওপর আস্থা রেখে ফিরে আসবেন।

আলতাফ হুসাইন আরও জানান, দেশের একটি বড় শাখা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, আগের তুলনায় হিসাব বন্ধের (অ্যাকাউন্ট ক্লোজড) পরিমাণ প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে, যা গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসার ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।

ইসলামী ব্যাংকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ পেশাদার পর্ষদ গঠনের দাবি গ্রাহক ফোরামের

দেশের বৃহত্তম শরিয়াভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একজন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পর ব্যাংকটির গ্রাহক, আমানতকারী ও প্রবাসীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দাবি করেছে, প্রশাসক নিয়োগ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ, যোগ্য ও পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠন করাই ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ।

গতকাল সোমবার রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির আহ্বায়ক অধ্যাপক নূরনবী মানিক লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিনের সংকট, অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং পরিচালনাগত দুর্বলতার কারণে ইসলামী ব্যাংক যে পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি ব্যাংক নয়; এটি প্রায় কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ফলে ব্যাংকটিকে ঘিরে যেকোনো সিদ্ধান্ত সরাসরি আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। গ্রাহক ফোরামের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে তারা বারবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের অপসারণ, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের পুনর্বহাল এবং একটি গ্রহণযোগ্য পরিচালনা কাঠামো গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এসব দাবির পরিবর্তে বাংলাদেশ ব্যাংক পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে একজন প্রশাসকের হাতে সব ক্ষমতা তুলে দিয়েছে।

সংগঠনটির মতে, একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থা কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত নয়। কারণ এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে যায় এবং অংশীজনদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না। তবে তারা এটিও স্বীকার করেছে, ব্যাংকের লেনদেন সচল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে তারল্য সহায়তা দিয়েছে এবং বিতর্কিত চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দিয়েছে, তা কিছুটা স্বস্তির কারণ হয়েছে।