ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

২০২৬-২৭ অর্থবছর

ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার হতে পারে

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ০৫:৫০ এএম

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) সনদ দাখিলের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার হতে পারে। এখনই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও প্রত্যাহারের বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংসদে প্রস্তাবিত অর্থবিল, ২০২৬-এর বেশকিছু বিষয়ে সংশোধনী আনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন সনদের বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও রয়েছে। তবে এখনই এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার পর প্রয়োজনীয় সংশোধনী সহকারে অর্থবিল, ২০২৬-এ সংযুক্ত করা হবে। তারপর সংসদে অনুমোদিত হলে তা কার্যকর হবে।

এখানে প্রসঙ্গত, গত ১১ জুলাই জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ওই দিনই অর্থবিল, ২০২৬ সংসদে উপস্থাপন করেন তিনি। অর্থবিলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদের বাধ্যবাধকতা আরোপ করার প্রস্তাব করা হয়। তবে সাধারণ শিক্ষার্থী, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে সরকারি ভাতাভোগী ব্যক্তি কিংবা বিশেষ গেজেটপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এতে।

মূলত করের আওতা বৃদ্ধি, করফাঁকি রোধ ও অবৈধ বা বড় অংকের লেনদেনের ওপর নজরদারি জোরদার করার মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ দাখিলের বাধ্যবাধকতা আরোপের বিষয়টি অর্থবিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কিন্তু টিআইএন সনদের বাধ্যবাধকতা আরোপের ফলে সাধারণ মানুষকে বাড়তি বিড়ম্বনা, হয়রানির শিকার হওয়ার পাশাপাশি অনেকেই ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে চলে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে টিআইএন সনদের বাধ্যবাধকতা চালুর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্নেহাশীষ মাহমুদ অ্যান্ড কোম্পানির (এসএমএসি) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের মধ্যে এক ধরনের সংকট বিরাজ করছে। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে টিআইএনের বাধ্যবাধকতার কারণে তাদের নানা ধরনের বিড়ম্বনা কিংবা হয়রানির শিকার হতে হবে। এ কারণে তারা ভয় পাচ্ছে। ফলে ভয়ের কারণে অনেকেই ব্যাংকিং চ্যানেলে আসতে চাইবে না। এতে সরকারের লক্ষ্য অর্জিত হবে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এদের আয় করযোগ্য সীমার অনেক নিচে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সময় টিআইএন বাধ্যতামূলক হলে এদেরও টিআইএন নিতে হবে। অথচ এদের আয়ের সঙ্গে আয়করের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে এটি সাধারণ মানুষের কাছে একটি বাড়তি প্রশাসনিক বোঝা বা ঝামেলা হিসেবে বিবেচিত হবে। উপরন্তু টিআইএন থাকলে প্রতি বছর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। অনেক নি¤œআয়ের মানুষ, যারা শুধু ব্যাংকে টাকা রাখার জন্য অ্যাকাউন্ট খোলেন, তাদের পক্ষে প্রতি বছর রিটার্ন দাখিলের জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বেশ কঠিন। রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানা বা আইনি জটিলতার ভয় অনেকের মধ্যেই কাজ করে।

সংশ্লিষ্টরা এই শর্ত আরোপের ফলে অনেক মানুষ, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এর ফলে তারা পুনরায় দাপ্তরিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যেতে পারেন। সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা। কিন্তু টিআইএন সনদের বাধ্যবাধকতার কারণে সে লক্ষ্য বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে আগামী করবর্ষে রিটার্ন দাখিলের সময় করদাতার নামে থাকা ব্যাংকের চারটি তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য বিবরণীতে যুক্ত হবে। তথ্যগুলো হলোÑ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, ব্যাংকের স্থিতি, অর্জিত সুদ ও সুদ থেকে কর্তিত টাকার পরিমাণ ও বিভিন্ন চার্জ বাবদ কর্তিত টাকার পরিমাণ। অবশ্য করদাতার সম্মতিসাপেক্ষে এসব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হবে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে ইচ্ছুক না হলে করদাতাকে ম্যানুয়ালি এসব তথ্য আয়কর রিটার্নে দাখিল করতে হবে।