বিদেশি ঋণ পরিশোধে চাপ আরও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই (জুলাই-মে) বিদেশি ঋণদাতাদের অতীতের ঋণের সুদ, আসলসহ ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের বেশি শোধ করতে হয়েছে। এর বড় অংশই গেছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপানের কাছে। সার্বিকভাবে বিদেশি ঋণের অর্থছাড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সুদাসল পরিশোধ করতে হচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জুলাই-মে মাসের বিদেশি ঋণ পরিস্থিতির হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দেখা গেছে, ওই ১১ মাসে আগের নেওয়া ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ঋণ দাতাসংস্থা ও দেশকে ৪১৩ কোটি ২৩ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে, যা বিদেশি ঋণ শোধে নতুন রেকর্ড। এ ছাড়া টাকার হিসাবে ওই সময়ে ৫০ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা অর্থাৎ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি শোধ করতে হয়েছে। জুলাই-মে সময়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদান এসেছে প্রায় ৪৫৮ কোটি ডলার।
কয়েক বছর ধরে বিদেশি ঋণ পরিশোধে চাপ বেড়েছে। গত অর্থবছরে প্রথমবারের মতো চার বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। গত অর্থবছরের বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল মিলিয়ে ৪০৯ কোটি ডলার শোধ করেছে বাংলাদেশ। এবার ১১ মাসেই এর চেয়ে বেশি শোধ করল বাংলাদেশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ শোধের পরিমাণ ছিল ৩৩৭ কোটি ডলার।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, একই ধারায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হলে এ বছর বিদেশি ঋণ শোধের পরিমাণ সাড়ে ৪ বিলিয়ন বা ৪৫০ কোটি ডলার পার হতে পারে।
ইআরডির প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) বিদেশি ঋণের আসল ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ডলার ও সুদ ১৪৫ কোটি ডলার শোধ করেছে সরকার। অন্যদিকে ৪১৪ কোটি ডলার ঋণ হিসেবে এবং ৪৩ কোটি ডলার অনুদান হিসেবে পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতিও কমেছে। ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ৪২২ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে সাড়ে ৫০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল। গত ১১ মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক দিয়েছে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার। এরপর আছে রাশিয়া। রাশিয়া ৯৩ কোটি ডলার। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে ৭৮ কোটি ডলার। চীন ও ভারত ছাড় করেছে যথাক্রমে ৫৩ কোটি ডলার ও ২৫ কোটি ডলার। জাপান দিয়েছে ৪৩ কোটি ডলার। সরকার বাজেটের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ ও অনুদান নেয়। এ ছাড়া বাজেট সহায়তা হিসেবেও অর্থ নেয়। এ ছাড়া বেসরকারি খাতকেও উন্নয়ন সহযোগীরা ঋণ দেয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ ‘আর্টিকেল ফোর কনসালটেশন রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮৮ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে। এটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪১ শতাংশের সমান। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩৯ শতাংশ। বাংলাদেশের অন্যতম বড় ঋণদাতা সংস্থা আইএমএফ তাদের ঋণ স্থায়িত্ব বিশ্লেষণে বাংলাদেশকে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ থেকে ‘মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকায় স্থান দিয়েছে। ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, জিডিপির তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ, রপ্তানি আয় ও রাজস্ব আদায়ের দুর্বল অবস্থার ভিত্তিতেই এই মূল্যায়ন করা হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এই ঋণ পরিশোধের চাপ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। সরকার ইতোমধ্যে তাদের প্রথম প্রস্তাবিত বাজেট পেশ। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে বাংলাদেশকে ৩০ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ২৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, অতীতে নেওয়া উচ্চ সুদের এবং স্বল্প গ্রেস পিরিয়ডের বিদেশি ঋণ এখন বড় চাপ তৈরি করছে। এ ছাড়া মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় বাজেট টিকিয়ে রাখতে নেওয়া বিপুল ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়ও এখন চলে এসেছে। এই বাড়তি ঋণ পরিশোধের চাপ সরকারের আর্থিক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাজেট ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে পড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমাতে এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল অর্থায়নের জন্য সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভ্যন্তরীণ ঋণের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। কিন্তু এতে সুদের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশই গেছে অভ্যন্তরীণ ঋণের পেছনে। সমপর্যায়ের অন্যান্য অর্থনীতির তুলনায় এই হার অনেক বেশি। আইএমএফ আরও সতর্ক করেছে, ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে। এতে আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা ব্যাংক খাত আরও সংকটে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে ঋণের এই চাপ সামাল দেওয়া আরও কঠিন হবে। আইএমএফ তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, রাজস্ব আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধ ও সুদ ব্যয়ের উচ্চ হার আগামী বছরগুলোতে রোলওভার বা পুনঃঅর্থায়নের ঝুঁকি বাড়াবে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৭ শতাংশের নিচে, যা এ অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম কম। ফলে সরকারের পক্ষে বাড়তে থাকা ঋণের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

