ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

বিশ্বকাপে দুই মহাতারকার মহাকাব্য

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২৬, ০৭:২৩ এএম

২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিল আধুনিক ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ। একদিকে মেসির আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে এমবাপ্পের ফ্রান্স। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনা জিতে গেলেও, এই ম্যাচ দুই প্রজন্মের লড়াইকে ইতিহাসে অমর করে দেয়। দুই প্রজন্মের দুই সুপারস্টারের এই গল্প কেবল গোল বা ট্রফির নয়, এটি ধারাবাহিকতা, প্রতিভা, নেতৃত্ব এবং বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেকে বারবার প্রমাণ করার গল্প। তাদের গল্প তুলে ধরেছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন

বিশ্বকাপে মেসি-এমবাপ্পে

মেসির বিশ্বকাপ অভিষেক ২০০৬ সালে। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬, টানা ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি বিরল এক রেকর্ড গড়েছেন। ২০১৪ সালে ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, ২০১৮ সালে হতাশা এবং অবশেষে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ করেন।

অন্যদিকে এমবাপ্পের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার শুরু হয় ২০১৮ সালে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসেন। ২০২২ সালের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে পরাজিত দলের হয়েও ইতিহাসের অংশ হয়ে যান। সেই ধারাবাহিকতা তিনি ২০২৬ সালেও ধরে রেখেছেন।

মেসির অবিশ্বাস্য ফর্ম

২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে তিনি টুর্নামেন্টে নিজের যাত্রা শুরু করেন এবং পরে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যান। এই পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে আসেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলমান আসরে তার মোট বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ১৮-তে পৌঁছেছে, যা একটি নতুন ইতিহাস।

তবে মেসির গুরুত্ব শুধু গোলে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি আক্রমণ গড়ে তোলেন, মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করেন, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেন এবং প্রয়োজনে নিজেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। বয়স বাড়লেও তার ফুটবল বুদ্ধিমত্তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনো বিশ্বের সেরাদের মধ্যে অন্যতম।

গতি-গোলের সমন্বয় এমবাপ্পের

ফ্রান্সের হয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পেও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখাচ্ছেন। সেনেগাল ও ইরাকের বিপক্ষে গোল করে তিনি ফ্রান্সের সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলদাতাদের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন। চলমান বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে তিনি ১৬ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাত্র তিনটি বিশ্বকাপ খেলেই এই সাফল্য এমবাপ্পের অসাধারণ ধারাবাহিকতার প্রমাণ। তার গতি, ড্রিবলিং, ফিনিশিং এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করার ক্ষমতা তাকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ডে পরিণত করেছে।

২০২২ থেকে ২০২৬

কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ। মেসি করেছিলেন জোড়া গোল, এমবাপ্পে করেছিলেন হ্যাটট্রিক। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা, কিন্তু সেই ম্যাচ দুই তারকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

২০২৬ বিশ্বকাপে এসে সেই গল্পের নতুন অধ্যায় লেখা হচ্ছে। মেসি অভিজ্ঞতার আলোয় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আর এমবাপ্পে নিজের গতিময় ফুটবল দিয়ে ফ্রান্সকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে এগিয়ে নিচ্ছেন।

পরিসংখ্যানের বাইরে

মেসির খেলার সবচেয়ে বড় শক্তি হলোÑ খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। তিনি কখন আক্রমণ বাড়াবেন, কখন বল ধরে রাখবেন কিংবা কখন একটি নিখুঁত পাস দিয়ে রক্ষণ ভেঙে দেবেনÑ এসব সিদ্ধান্ত তিনি মুহূর্তের মধ্যে নিতে পারেন। এমবাপ্পের শক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বল পেলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারেন। ডিফেন্ডারদের পেছনে ফেলে দ্রুত দৌড়, বক্সের বাইরে থেকে শট এবং একের বিপরীতে এক পরিস্থিতিতে অসাধারণ ফিনিশিং তাকে প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ংকর করে তোলে।

উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যৎ

২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়গুলোর একটি। কিন্তু তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন যে অভিজ্ঞতা, পরিশ্রম এবং মানসিক দৃঢ়তা থাকলে বয়স কেবল একটি সংখ্যা। অন্যদিকে এমবাপ্পে প্রমাণ করছেন যে আগামী এক দশক বিশ্ব ফুটবলের নেতৃত্ব দেওয়ার সামর্থ্য তার রয়েছে। একজন ইতিহাস গড়েছেন, অন্যজন সেই ইতিহাসকে নতুন রূপ দিতে চলেছেন। মেসির জন্মদিনের আবহে ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং দুই প্রজন্মের দুই অসাধারণ ফুটবল শিল্পীর যৌথ মহাকাব্য। প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি গোল এবং প্রতিটি মুহূর্তে তারা কোটি কোটি সমর্থককে মনে করিয়ে দিচ্ছেন মহান খেলোয়াড়েরা শুধু ট্রফি জেতেন না, তারা সময়কেও অতিক্রম করে কিংবদন্তিতে পরিণত হন।