ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬

খেলাপি হয়েও এলসি খোলার বিশেষ সুযোগ!

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৫:৪৩ এএম

৬৯৮ কোটি টাকা ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডকে (এএমএসআরএল) শতভাগ মার্জিনের বিপরীতে আমদানি ঋণপত্র (ইমপোর্ট এলসি) খোলার বিশেষ অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ এর ১২১ ধারার ক্ষমতাবলে দেওয়া এ অনুমতি আগামী ৩১ জুলাই ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তপশিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) কাছে পাঠিয়েছে। সার্কুলারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পৃথক প্রজ্ঞাপনের অনুলিপিও সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যেকোনো তপশিলি ব্যাংক আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডের অনুকূলে শতভাগ মার্জিনের বিপরীতে আমদানি এলসি খুলতে পারবে। তবে এ অনুমতির কারণে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর কোনো আর্থিক দায় সৃষ্টি হবে না। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি বা সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যাংক সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা দাবি করতে পারবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিষ্ঠানটি কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারবে। তবে এলসির পুরো মূল্য আগাম মার্জিন হিসেবে জমা রাখতে হবে। ফলে ব্যাংকের ঋণঝুঁকি কার্যত থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের মার্চের তথ্য অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকসহ ২৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আবদুল মোনেম লিমিটেডের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু অগ্রণী ব্যাংকের পাওনাই প্রায় ৪৫৫ কোটি টাকা। এর আগে, গত বছরের আগস্টে আবদুল মোনেম গ্রুপ খেলাপি ঋণ বিশেষ শর্তে পুনর্গঠনের আবেদন করে। পরে চলতি বছরের ৭ জুন শতভাগ মার্জিনে এলসি খোলার বিশেষ সুবিধা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের কাছে আবেদন জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

আবেদনে বলা হয়, অপরিশোধিত চিনি আমদানির জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কয়েকটি চুক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে। সময়মতো এলসি খুলতে না পারলে প্রতিদিন প্রায় ২৩ হাজার মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ গুনতে হতে পারে। পাশাপাশি বর্তমানে দেশে হাতেগোনা কয়েকটি চিনি শোধনাগার পূর্ণ সক্ষমতায় চালু থাকায় তাদের আমদানি ব্যাহত হলে বাজারে চিনির সরবরাহেও সংকট দেখা দিতে পারে। বর্তমানে ক্রয়চুক্তির ভিত্তিতে আবুল খায়ের লিমিটেড শোধনাগারটি পরিচালনা করছে। এখানকার উৎপাদিত চিনি ‘স্টারশিপ সুগার’ ব্র্যান্ড নামে বাজারজাত করা হচ্ছে।

যদিও প্রজ্ঞাপনটি আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডের নামে জারি হয়েছে, বাস্তবে এর সুবিধাভোগী হবে আবুল খায়ের গ্রুপ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবুল খায়ের গ্রুপ প্রতিষ্ঠানটি অধিগ্রহণের চুক্তি করেছে এবং বর্তমানে তারাই কারখানাটি পরিচালনা করছে। এই কারখানায় উৎপাদিত চিনি এখন ‘স্টারশিপ সুগার’ ব্র্যান্ডে বাজারজাত করা হচ্ছে। তবে মালিকানা হস্তান্তরের পূর্ণাঙ্গ আইনি ও ব্যাংকিং প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন না হওয়ায় কাগজে-কলমে কোম্পানিটির নাম এখনো আগের অবস্থাতেই রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তে কাঁচা চিনি আমদানির জটিলতা অনেকটাই কমবে এবং দেশের অন্যতম বড় চিনিশোধন কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করবে।

প্রসঙ্গত, ১৯৫৬ সালে প্রয়াত শিল্পপতি আব্দুল মোনেম এই গ্রুপটি প্রতিষ্ঠা করেন। কয়েক দশক ধরে নির্মাণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, কোমল পানীয়, ওষুধ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসার প্রসার ঘটায় গ্রুপটি। ২০০৭ সালে সুগার রিফাইনারিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ২০২০ সালে আব্দুল মোনেমের মৃত্যুর পর অতিরিক্ত ঋণ খরচ, টাকার অবমূল্যায়ন এবং সরকারের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের গতি ধীর হয়ে যাওয়ায় গ্রুপটির বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে।