দেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট একসঙ্গে আয়োজনের কারণে নির্বাচনি ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়েছে। এই দুই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনি খাতে অতিরিক্ত এক হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে আসন্ন নির্বাচন ঘিরে সরকারের মোট সম্ভাব্য ব্যয় তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাড়তি এই অর্থ দুই ধাপে ছাড় করা হবে। প্রথম ধাপে ৫০০ কোটি টাকা চলতি সপ্তাহেই নির্বাচন কমিশনের অনুকূলে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপের অর্থ পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন ও অগ্রগতির ভিত্তিতে ছাড় করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল দুই হাজার ৮০ কোটি টাকা। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট যুক্ত হওয়ায় নির্বাচন পরিচালনার কাঠামো, জনসচেতনতা কার্যক্রম ও মাঠ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনার পরিধি বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বাস্তবতায় সংশোধিত বাজেটে আরও এক হাজার ৭০ কোটি টাকা যুক্ত করে মোট বরাদ্দ তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সম্মতি, কেন প্রয়োজন বাড়তি অর্থ
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি একটি আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। চিঠিতে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজন করতে হলে নির্বাচন প্রশাসনের জন্য বাড়তি প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক সহায়তা, ভোটগ্রহণ সামগ্রী ও সচেতনতামূলক প্রচারণা অপরিহার্য।
অর্থ বিভাগ গত বুধবার এই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এবার নির্বাচন শুধু একটি নিয়মিত সংসদ নির্বাচন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গণভোট, যা সাংবিধানিক ও প্রশাসনিকভাবে একটি ভিন্ন ধরনের নির্বাচন প্রক্রিয়া। ফলে প্রচলিত নির্বাচনি অবকাঠামোর বাইরে গিয়েও অতিরিক্ত সক্ষমতা গড়ে তুলতে হচ্ছে।
বিশেষ করে গণভোটের ক্ষেত্রে কোনো প্রার্থী বা প্রতীক না থাকায় ভোটারদের কাছে বিষয়বস্তু পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনকে আলাদা ও বিস্তৃত জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, যার বড় অংশই ব্যয়সাপেক্ষ।
কোথায় কত খরচ বাড়ছে
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, সংশোধিত বাজেটে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতেই ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সংসদ নির্বাচনের প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে মূল বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩৩ কোটি টাকা। গণভোট যুক্ত হওয়ায় এই খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা প্রায় ১৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য নির্বাচন সরঞ্জাম কেনার ব্যয় ছয় গুণ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৭০ কোটি টাকায়। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যানবাহন, ভোটগ্রহণ সামগ্রী পরিবহন এবং মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী চলাচলের কারণে পরিবহন খাতে ব্যয় ৬৩ শতাংশ বেড়ে ৮০ কোটি ১২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মুদ্রণ ও বাঁধাই খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮ কোটি টাকা। ব্যালট পেপার, নির্দেশিকা, পোস্টাল ব্যালট এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক উপকরণ ছাপানোর কারণে এই খাতে ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে মনিহারি খাতে বরাদ্দ ৫৮১ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় ৩১৫ শতাংশ বেশি।
ব্যালট বাক্স খাতে ব্যয় এক কোটি টাকা থেকে বেড়ে পাঁচ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। সম্মানীভাতার খরচ ৪৯৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১৫ কোটি টাকা। আপ্যায়ন খাতে ব্যয় ২২০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯০ কোটি টাকা করা হয়েছে। খোরাকি ভাতার বরাদ্দও বেড়ে ৫১২ কোটি টাকা থেকে ৭৩০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনি ব্যয়ের প্রায় ২০টি প্রধান খাতের মধ্যে ১৭টিতেই ব্যয় বেড়েছে। এতে নির্বাচন পরিচালনার সামগ্রিক ব্যয় কাঠামো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
নির্বাচন কমিশনের বাজেটের বছরভিত্তিক তুলনা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল এক হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন নির্বাচন আয়োজনের জন্য রাখা হয়েছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবেÑ এই বিবেচনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে ইসির মোট বরাদ্দ ধরা হয় দুই হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা।
এই বরাদ্দের মধ্যে পরিচালন ব্যয় ছিল দুই হাজার ৭২৭ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ছিল ২২৯ কোটি টাকা। এই মোট বরাদ্দের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রাথমিকভাবে দুই হাজার ৮০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সংশোধিত বাজেটে এখন এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত এক হাজার ৭০ কোটি টাকা।
অতীতের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা আরও স্পষ্ট। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। তবে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে এই বরাদ্দ বাড়িয়ে চার হাজার ১৯০ কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যয় ছিল দুই হাজার ২৭৬ কোটি টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে কোনো জাতীয় নির্বাচন না থাকায় নির্বাচন কমিশনের মোট ব্যয় ছিল ৮৭৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল আনুমানিক এক হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমান পরিকল্পিত ব্যয়ের চেয়ে প্রায় তিন গুণ কম।
গণভোট যুক্ত হওয়ায় বেড়েছে প্রস্তুতির মাত্রা
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে- ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে। তবে এসব গণভোটের কোনোটিই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে অনুষ্ঠিত হয়নি। এবারই প্রথমবারের মতো এক দিনে দুটি ভিন্ন ধরনের জাতীয় ভোট আয়োজন করা হচ্ছে।
অতীতের গণভোটে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মতে, সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট যুক্ত হলে ভোটকক্ষের সংখ্যা বাড়াতে হয়, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও সহকারী কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং প্রশিক্ষণের পরিধিও বড় হয়। একই সঙ্গে ভোটারসংখ্যার অনুপাতে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্সসহ অন্যান্য সরঞ্জামের চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়।
গণভোটে কোনো প্রার্থী বা প্রতীক না থাকায় ভোটারদের কাছে বিষয়বস্তু স্পষ্ট করা একটি বড় প্রশাসনিক দায়িত্ব হয়ে পড়ে। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ভোটারদের বোঝাতে নির্বাচন কমিশনকেই ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হয়, যা নির্বাচনী ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
প্রবাসী ভোট : নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন ব্যয়
এবারের নির্বাচন ও গণভোটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার জন্য দেশে ও বিদেশে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এই নিবন্ধন কার্যক্রম শেষ হয় গত ৫ জানুয়ারি মধ্যরাতে।
‘আউট অব কান্ট্রি ভোটিং (ওসিভি)’ ও ‘সিরিয়াল ডিজিটাল ইন্টারফেস (এসডিআই)’ প্রকল্পের সূত্র অনুযায়ী, বিশ্বের ১২৩টি দেশ থেকে সাত লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসী বাংলাদেশি পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধন করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, একজন প্রবাসী ভোটারের ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারকে গড়ে প্রায় ৭০০ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যালট ছাপানো, ডাকযোগে পাঠানো, ফেরত আনা এবং নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার খরচ।
নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের একটি সূত্র রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বাড়তি অর্থের পুরোটা গণভোটের জন্য ব্যয় হবে- এমনটা নয়। মূল বাজেটে যে বরাদ্দ রয়েছে, তা দিয়ে নির্বাচন ও গণভোটের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনায় অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে। সে কারণেই সমন্বিতভাবে বাড়তি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করছে। এই নতুন বাস্তবতায় প্রশাসনিক সক্ষমতা, ভোটার অংশগ্রহণ ও প্রবাসী ভোট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে গিয়ে নির্বাচনী ব্যয় যে বড় হচ্ছে, তা অস্বীকারের সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও ব্যয় সংকোচনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের বেতনের পাশাপাশি আলাদা ভাতা, একাধিক খাতে সম্মানী এবং প্রশাসনিক ব্যয়Ñ এসব খরচ নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

