নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’-এর জয় কেবল একটি ভোটের ফল নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পুরোনো কেন্দ্রীভূত কাঠামোর বিরুদ্ধে স্পষ্ট জনরায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে চার কোটি ৮০ লাখের বেশি ভোটার একযোগে বার্তা দিয়েছেন, এককেন্দ্রিক ক্ষমতার যুগ শেষ হোক, ভারসাম্য ও জবাবদিহির নতুন অধ্যায় শুরু হোক। ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি ভোটারের দেশে সাত কোটিরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণের এই রায় এখন সংবিধান সংশোধনের দরজায় কড়া নাড়ছে। জুলাই জাতীয় সনদের ৪৮ দফা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ খুলে গেছে। সামনে এখন বাস্তবায়নের কঠিন পরীক্ষা। সংবিধান সংস্কার পরিষদ কি ১৮০ কার্যদিবসের ভেতর এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব শেষ করতে পারবে, নাকি জনরায়ের শক্তি রাজনৈতিক টানাপোড়েনে থমকে যাবেÑ সেটিই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’র জয় দেশের সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮ দফা সংস্কার প্রস্তাবে জনগণের সম্মতি পাওয়ায় এখন বাস্তবায়নের ধাপ শুরুর অপেক্ষা। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধন সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই এখন মূল কাজ।
গণভোটের ফল স্পষ্ট বার্তা :
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার হোসেন গতকাল শুক্রবার বিকেলে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের বেসরকারি ফল ঘোষণা করেন।
মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৫ জন। এর মধ্যে সাত কোটি ছয় লাখ ৪০ হাজার ৫৬ জন গণভোটে অংশ নেন। অর্থাৎ ভোটের হার ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছে চার কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি, যা মোট ভোটের ৬৮ দশমিক ০৬ শতাংশ। বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছে দুই কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি, যা ৩১ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
সংখ্যাগতভাবে ব্যবধান দুই কোটিরও বেশি। নির্বাচন কমিশন সচিবের ভাষায়, জনগণ সুস্পষ্টভাবে মত দিয়েছেন। এই ফল শুধু কোনো নীতিগত প্রস্তাবের পক্ষে মত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে একটি সাংবিধানিক দিকনির্দেশনা।
তিন ধাপের সংস্কার প্রক্রিয়া :
সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮ প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য তিনটি ধাপ নির্ধারিত হয়েছে। প্রথম ধাপে আইনি ভিত্তি। গত ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন। এর মাধ্যমে গণভোট আয়োজনের সাংবিধানিক পথ সুগম হয়। দ্বিতীয় ধাপে গণভোট। ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যা এখন ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় দিয়ে শেষ হয়েছে। তৃতীয় ধাপ হলো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন হবে। সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফল অনুসারে সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন না হলে কী হবে, তা বাস্তবায়ন আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। এই বিষয়টি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় রদবদল :
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাহী ক্ষমতার প্রায় সবই প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। রাষ্ট্রপতি কার্যত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেনÑ প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ব্যতীত।
সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। এতে ক্ষমতার কেন্দ্রিকতা কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে। যদিও এ প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত ছিল, বিশেষত বিএনপি মেয়াদসীমা প্রশ্নে আপত্তি জানিয়েছিল।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি :
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন, এমন প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে আছে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। বর্তমানে এসব ক্ষেত্রে কার্যত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ বা সরকারের সুপারিশ মুখ্য। সংস্কার বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক সক্রিয়তা বাড়বে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বহুমাত্রিক ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে কাঠামোগত পরিবর্তন :
বর্তমানে বাংলাদেশে এককক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ রয়েছে। সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষে থাকবেন ১০০ সদস্য, যারা নি¤œকক্ষের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে নির্বাচিত হবেন, অর্থাৎ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি বা পিআর পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে।
সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজন হবে নি¤œকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন আর উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন। ফলে কোনো একক দল বা জোটের পক্ষে একতরফা সংশোধন করা কঠিন হয়ে যাবে। সাংবিধানিক পরিবর্তনে বিস্তৃত ঐকমত্য অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
সংসদ সদস্যদের ভোটের স্বাধীনতা :
সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সংসদে ভোটদানের ক্ষেত্রে সদস্যদের স্বাধীনতার পরিসর বাড়ানো হবে। বর্তমানে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সদস্যপদ বাতিলের ঝুঁকি থাকে। এই বিধান শিথিল হলে আইন প্রণয়নে ব্যক্তিগত বিবেচনা ও জনমতের প্রতিফলন বাড়তে পারে।
১৯টি মৌলিক সংস্কার :
৪৮টি সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাবের মধ্যে ১৯টিকে ‘মৌলিক সংস্কার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, বিরোধীদলীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ (ডেপুটি স্পিকার ও কমিটি সভাপতির পদে) এবং নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি। এই ১৯টি সংস্কার কার্যকর হলে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে পারে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আগের তিন গণভোট :
বাংলাদেশে এর আগে তিনবার গণভোট হয়েছেÑ ১৯৭৭ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি আস্থায় ৯৮ দশমিক ৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে। ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পদে থাকা ও নীতির প্রশ্ন প্রায় ৯৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে। তৃতীয়টি ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দ্বাদশ সংশোধনী বিল-সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তনে ৮৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ পড়ে।
১৯৯১ সালের গণভোট সরাসরি সরকারব্যবস্থা নির্ধারণ করেছিল। ২০২৬ সালের গণভোটও রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে সমপর্যায়ের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করছে। যদিও এবার প্রশ্ন ছিল একাধিক সংস্কারের সম্মিলিত প্যাকেজে সম্মতি।
রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব :
গণভোটের ফলে কয়েকটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রভাব প্রত্যাশিত। সেগুলো হলো, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা ও দলীয় প্রধানের ভূমিকা পৃথকীকরণ। রাষ্ট্রপতির সক্রিয়তা বৃদ্ধিতে নিয়োগ ক্ষমতা প্রসার। আইন প্রণয়নে ঐকমত্যের বাধ্যবাধকতায় দ্বিকক্ষব্যবস্থা এবং দলীয় শৃঙ্খলা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ভারসাম্য রক্ষায় সংসদ সদস্যদের ভোটের স্বাধীনতা। এতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ-নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য জোরদার হতে পারে।
সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চয়তা :
তবে কয়েকটি প্রশ্নও রয়ে গেছেÑ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন না হলে বিকল্প ব্যবস্থা কী? উচ্চকক্ষ নির্বাচন ও পরিচালনার সুনির্দিষ্ট বিধান কবে প্রণয়ন হবে? রাষ্ট্রপতির বর্ধিত ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগে কি নতুন সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে সংস্কার পরিষদের কার্যকারিতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
যে প্রশ্নে ভোট :
গণভোটে ভোটারদের হাতে দেওয়া হয় আলাদা ব্যালট। সেখানে একটিমাত্র প্রশ্ন ছিল, আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?
প্রশ্নের অধীনে চারটি মৌলিক দিক তুলে ধরা হয়েছিলÑ ১. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গঠন পদ্ধতি। ২. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন। ৩. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি প্রভৃতি বিষয়ে ঐকমত্যপ্রাপ্ত ৩০ প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা এবং ৪. জুলাই সনদের অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন।
একটি প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে ভোটাররা সম্মিলিতভাবে এই চার মাত্রিক সংস্কার প্যাকেজের ওপর মতামত দেন।

