ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

প্রস্তুত সংসদ সচিবালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ

কাল সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার শপথ

হাসান আরিফ
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ১২:৩৪ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭ জন নির্বাচিত সদস্যের গেজেট প্রকাশের পর নতুন আইনপ্রণেতাদের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা এ তথ্য জানিয়েছেন। সংবিধানে নির্ধারিত সময়সীমা বিবেচনায় নিয়ে আগামীকাল সোমবার শপথের জন্য জাতীয় সংসদ সচিবালয় প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। একই দিন নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হবে, জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ। তবে এরপরই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয় মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদের। গেজেট প্রকাশ থেকে শপথ, তারপর সরকার গঠনÑ এই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল এখন সময়ের অপেক্ষা। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দুই দশক পর আবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।

এর আগে গত শুক্রবার রাতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ২৯৭ জন নির্বাচিত সদস্যের গেজেট প্রকাশ করে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৮(২ক) অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ করতে হয়। সে হিসাবে গতকাল শনিবার থেকে গণনা করলে ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবারের মধ্যে শপথ সম্পন্ন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই সময়সীমাকে সামনে রেখে জাতীয় সংসদ সচিবালয় কাল সোমবারকে সম্ভাব্য শপথের দিন হিসেবে ধরে প্রস্তুতি চূড়ান্ত করছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাল সকালে সিইসি সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন হবে আর বিকেলে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীদের শপথ পড়াবেন।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা গতকাল বলেছেন, প্রস্তুতি অনেক আগেই শুরু হয়েছে এবং এটি সংসদ সচিবালয়ের নিয়মিত দায়িত্ব। অন্যদিকে সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সোমবারকে (কাল) ধরে সব লজিস্টিক ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে জনগণের রায় সাংবিধানিক রূপ পেয়েছে। এখন শপথ, সংসদের প্রথম অধিবেশন এবং মন্ত্রিসভার শপথÑ এই তিন ধাপ পেরোলেই নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। সময়সীমা অল্প, প্রস্তুতি বিস্তৃতÑ সব মিলিয়ে রাজধানীজুড়ে প্রশাসনিক তৎপরতা চোখে পড়ার মতো।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাল সকালে শপথ হওয়ার পর সরকার গঠনের প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যাবে। সংবিধান নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনেই দ্রুত কিন্তু সুশৃঙ্খল ট্রানজিশন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর কাজ করছে।

স্পিকার শূন্যতায় জটিলতা :

শপথকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন, কে শপথ পড়াবেন? দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বর্তমানে দায়িত্বে নেই এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুও অনুপস্থিত। ফলে নতুন সংসদের প্রথম শপথ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব নিয়ে এক ধরনের সাংবিধানিক ব্যাখ্যানির্ভর আলোচনা তৈরি হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার না থাকলে বা তারা শপথ পড়াতে অসমর্থ হলে প্রধান বিচারপতি অথবা প্রধান নির্বাচন কমিশনারও শপথ পাঠ করাতে পারেন, এমন বিকল্প রয়েছে’। তবে তিনি জানান, এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত সংসদ সচিবালয় থেকে জানানো হবে।

এর আগে নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৮-এর ৩ ধারার উল্লেখ করে বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে শপথ না হলে পরবর্তী পর্যায়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ করাতে পারেন’। আবার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি শপথ পড়াতে পারেন। অর্থাৎ সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে একাধিক বিকল্প উন্মুক্ত রয়েছে।

সংসদীয় কার্যপ্রণালির সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘শপথ না নিলে কেউ কার্যকর সংসদ সদস্য হন না। ফলে সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট, সংসদীয় দলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, চিফ হুইপ মনোনয়ন, সবই শপথের পর কার্যকর হবে’। তাঁর ভাষ্য, অতীতে বিশেষ পরিস্থিতিতে জ্যেষ্ঠ সদস্যের সভাপতিত্বে স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন করার নজির রয়েছে।

গেজেট-শপথ-সরকার, ধারাবাহিক সাংবিধানিক রূপরেখা :

গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম ধাপ শেষ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানান, ২৯৯ আসনের মধ্যে ২৯৭টির ফল ঘোষণা ও গেজেট জারি হয়েছে; আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফল পরে দেওয়া হবে।

ঘোষিত ফল অনুযায়ী, ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টি আসন পেয়েছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন, অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বাকি আসনে জয়ী হয়েছেন। ভোটের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ও প্রস্তাবিত সংস্কারের ওপর অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটের চূড়ান্ত ফল গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রকাশিত ফলে দেখা গেছে, সংবিধান সংস্কার অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ পক্ষে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি ভোট পড়েছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের সই করা এই গেজেট গত শুক্রবার রাতে বিজি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। গেজেটে জানানো হয়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি।

সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের শপথের পর সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করবেন রাষ্ট্রপতি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সংসদীয় নেতা নির্বাচন করবে এবং সেই নেতা রাষ্ট্রপতিকে জানাবেন যে, তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থা অর্জন করেছেন। এরপর রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন। প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়ার পর মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে।

বর্তমানে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আছেন মো. সাহাবুদ্দিন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিই প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথ পড়াবেন এবং অনুষ্ঠানটি বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি তিন দিন বা সর্বোচ্চ চার দিনের মধ্যে শপথ হয়ে যাবে’।

যেদিন এমপি, সেদিনই মন্ত্রী :

আইনপ্রণেতাদের শপথের সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তা জানান, শপথের দিনই সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তাঁর ভাষায়, যেদিন সকালে এমপি, সেদিনই বিকেলে সরকার গঠন হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, সংসদ সদস্যদের শপথের পর সংসদীয় দলনেতা নির্বাচন হবে। রাষ্ট্রপতি তাকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন। দলনেতা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সম্ভাব্য মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম পাঠাবেন। এরপর আমন্ত্রণপত্র জারি করে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ জানান, শপথ অনুষ্ঠানে কমবেশি এক হাজার দেশি-বিদেশি অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে; প্রয়োজন হলে আগামীকাল বা পরশুও আয়োজন সম্ভব।

সংসদ ভবন প্রস্তুত :

শপথকে সামনে রেখে জাতীয় সংসদ ভবনÑ এ পরিচ্ছন্নতা ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাহিদ পারভেজ বলেন, ‘সংসদ রেডি। সব অফিস রেডি। এখন শেষ মুহূর্তের ক্লিনিং চলছে। শপথ কক্ষ, অধিবেশন কক্ষ, স্পিকার ও রাষ্ট্রপতির অফিসকক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে; এমপি হোস্টেলেও শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে’।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট :

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠনের পথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। দলের ঘোষণায় এমনটাই বলা হয়েছে। ঘোষিত ফল অনুযায়ী বিএনপি ২০৯ আসন পেয়েছে, শরিকদের নিয়ে তাদের আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১২। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন পেয়েছে, তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যান্য শরিকরা ৯টি আসন নিয়ে মোট ৭৭টি।

এই ফলে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হলেও, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সরকার গঠন কার্যকর হচ্ছে না। তাই শপথ অনুষ্ঠান এখন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দুই দিক থেকেই কেন্দ্রবিন্দুতে।

জ্যেষ্ঠ সদস্যদের তালিকা :

সংসদ সচিবালয় থেকে বিএনপির চেয়ারম্যানের কাছে জ্যেষ্ঠ সদস্যদের একটি তালিকা পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। এই তালিকায় স্থান পেয়েছেনÑ খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ও জয়নুল আবদিন ফারুকসহ একাধিকবার নির্বাচিত সদস্য। স্পিকার নির্বাচন-পূর্ববর্তী অধিবেশন পরিচালনায় জ্যেষ্ঠ সদস্যদের ভূমিকা থাকতে পারে, এমন আলোচনা রয়েছে।

সময়সীমা ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা :

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে শপথ সম্পর্কিত বিধান স্পষ্ট। গেজেটের পর তিন দিনের মধ্যে শপথ সম্পন্ন না হলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে প্রশাসনিক ও প্রটোকল প্রস্তুতি দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। সংসদ সচিবালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কথায়, ‘প্রয়োজনীয় সব অপশন খোলা রাখা হয়েছেÑ স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধান বিচারপতি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার অর্থাৎ সংবিধানসম্মত যেকোনো পথেই শপথ সম্পন্ন করা সম্ভব’।