রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দীনসহ দুই দর্শনার্থীর ওপর ‘পুলিশি হামলার’ প্রতিবাদে শাহবাগ থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন সহপাঠিরা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১টায় রাজধানীর শাহবাগ থানার সামনে জড়ো হয়ে তারা তিনটি দাবি তুলে ধরেন। পরে বেলা আড়াইটার দিকে ডিএমপি কমিশনারের কাছে অভিযোগ দায়েরের ঘোষণা দিয়ে কর্মসূচি শেষ করেন শিক্ষার্থীরা। ‘পুলিশি হামলার’ প্রতিবাদে এর আগে এদিন বেলা ১২টায় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশ বিক্ষোভ করে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন।
বিক্ষোভকারীরা ‘হারুন গেছে যে পথে, মাসুদ যাবে সে পথে’, ‘আমার ভাইকে মারলো কেন, প্রশাসন চাই’, ‘শাহবাগ থানা জবাব চাই, আমার ভাইকে মারলো কেন’, ‘মাসুদের গদিতে, আগুন জ্বালো একসাথে’সহ নানা স্লোগান দেন।
জানা গেছে, গত সোমবার রাতে পুলিশের ‘মাদকবিরোধী অভিযানে’ দুই সাংবাদিক, শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দীনসহ কয়েকজন দর্শনার্থী পুলিশের মারধরের শিকার হন। ভুক্তভোগী দুই সাংবাদিক হলেনÑ বাংলানিউজের তোফায়েল আহমেদ (২৫) এবং আজকের পত্রিকার কাউসার আহমেদ রিপন (২৭)।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একদল পুলিশ সদস্য তোফায়েলকে লাঠি দিয়ে নির্বিচারে পেটাচ্ছেন। পরে অন্য পুলিশ সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যান। অভিযান চলাকালে ঢাবির তিন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলনের ঢাকা মহানগর ইউনিটের আহ্বায়ক নাঈম উদ্দীনকে পুলিশের মারধরের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ডিসি মাসুদ আলমের সঙ্গে কথা বলার সময় নাঈমকে পেছন থেকে টেনেহিঁচড়ে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছেন এক পুলিশ সদস্য।
বিক্ষোভে নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কাফিরা জাহান বলেন, ‘পুলিশসহ যেকোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রশ্ন করতে পারা নাগরিক অধিকার। আমরা ডিসি মাসুদ ও তার বাহিনীর বিচার চাই।’
থিয়েটার বিভাগের শিক্ষার্থী আশরাফুল আলম বলেন, ‘আজ আপনি মনে করছেন, একজন মাদকসেবী এই সন্দেহে তাকে হ্যারাজ করা যায়। পুলিশের এ ধরনের হ্যারাজমেন্ট চলতে থাকলে আমি-আপনি কেউ নিরাপদ নয়।’
বিক্ষোভ শেষে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের আবদুল্লাহ হেল বুবুন। দাবির মধ্যে রয়েছেÑ ডিসি মাসুদসহ হামলায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া। ক্যাম্পাস এলাকার ভেতরে ও বাইরে সব ধরনের পুলিশিং বন্ধ করা। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সর্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা।
ভুক্তভোগি নাঈম উদ্দীন বলেন, আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘বহু ভাষার সন্ধ্যা’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করছিলাম এবং ফেরার পথে পুলিশ আমাদের মুখোমুখি হয়। পরে তারা আমাদের কাছে অবৈধ কিছু না পেয়ে অভিযোগ তোলেন যে আমরা নাকি তাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছি। আমার মাথা, হাত ও পায়ে চোট লেগেছে। আমার সঙ্গে থাকা আরও এক বন্ধুকেও তারা মেরেছে।
শাহবাগ থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. খোকন মিয়া রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা বেলা ১টার দিকে থানার সামনে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করেন। এ সময় বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন। বেলা আড়াইটার দিকে তারা অবস্থান কর্মসূচি শেষ করে চলে যান।
চার পুলিশ সদস্য ক্লোজড : ঢাবি শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় জড়িত পুলিশের চার সদস্যকে ক্লোজড (প্রত্যাহার) করা হয়েছে। গতকাল ডিএমপির রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা কাটাকাটির জেরে দুই পক্ষের একটু বাড়াবাড়ির কারণে এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় ডিউটিতে থাকা পুলিশের চার সদস্যকে ক্লোজড করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ছাত্র ফেডারেশনের মানববন্ধন : ‘পুলিশি হামলার’ প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল দুপুরে রাজু ভাস্কর্যের সামনে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আরমানুল হক।
বলপ্রয়োগের ঘটনায় আসকের নিন্দা : পুলিশের বলপ্রয়োগ ও মারধরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। বিবৃতিতে আসক জানায়, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, পুলিশের উপস্থিতিতে সাংবাদিকদের শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দেওয়ার পরেও একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে বেধড়ক লাঠিপেটা ও কিল-ঘুষি মারার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার নামে কোনোভাবেই অতিরিক্ত বা অযৌক্তিক বলপ্রয়োগ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সাংবাদিকদেও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সহিংস আচরণ নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তির নিরাপত্তার অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আসক এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানায়।

