দেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান ধর্মভিত্তিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী হঠাৎ করে বহুমুখী সংকট ও মনস্তাত্ত্বিক চাপে পড়েছে। সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের প্রভাবশালী নেতা গাজী নজরুল ইসলামের একটি বিতর্কিত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর নতুন করে অস্বস্তি ও সমালোচনার মুখে পড়েছে দলটি। এক সময়ের ঘনিষ্ঠ জোটসঙ্গী বিএনপিও এখন জামায়াতকে রাজনৈতিক কিংবা সাংগঠনিকভাবে কোনোপ্রকার সুবিধা বা ছাড় দিতে রাজি নয়।
নেতৃত্বে ব্যক্তিগত বিতর্ক ও নৈতিক ধাক্কা : দলের নীতিনির্ধারণী ভাবমূর্তির পাশাপাশি জামায়াত নেতাদের ব্যক্তিগত বিতর্ক দলকে সামাজিকভাবে ব্যাকফুটে ঠেলে দিচ্ছে। নীতি ও আদর্শের বার্তা দেওয়া একটি ধর্মভিত্তিক দলের জন্য যা বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একটি ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই জামায়াত ঘরানার নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এমপি গাজী নজরুল ইসলাম অবশ্য ফেসবুকে এক দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়ে দাবি করেছেন, ঘটনাটি ষড়যন্ত্রমূলক এবং তা তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও, যা ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট চক্র ফাঁস করেছে। তিনি এই ঘটনাকে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চক্রান্ত বলে অভিহিত করেন।
জামায়াতের নীতি-আদর্শে বড় ধরনের ধাক্কা : ভিডিওটির সত্যতা ও এর নৈতিক দিক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশের রাজনীতিতে জামায়াতের নীতি-আদর্শের ভাবমূর্তি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। বিশেষ করে নৈতিকতার কথা বলা রাজনৈতিক দলের একজন সংসদ সদস্যের এই ধরনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সাধারণ জনগণের মাঝে জামায়াত চরম বেকায়দায় পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলা হলে তারা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের গণমুখী দল হিসেবে পুনর্গঠন ও উপস্থাপন করতে চাইলেও রাজপথ এবং সংসদÑ উভয় স্থানেই বিএনপির শক্ত কৌশলের মুখে পড়ছে। মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপি প্রকাশ্যে ও পরোক্ষভাবে জামায়াতকে কৌশলগত ফাঁদে রাখছে। সংসদীয় আসনগুলো ধরে রাখা থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত বিএনপি জামায়াতের দিকে কোনো শিথিলতা প্রদর্শন করছে না। বিএনপির এই অনমনীয় নীতি ও কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দেশের বিভিন্ন জেলায় জামায়াতের সাংগঠনিক কর্মকা-ে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলমান পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীকে টিকে থাকতে হলে তাদের দলীয় শৃঙ্খলা ও আদর্শিক বার্তার প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সংসদীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে না পারলে এবং বিএনপির কঠোর রাজনৈতিক কৌশলের মুখোমুখি হয়ে নিজস্ব অবস্থান পরিষ্কার করতে ব্যর্থ হলে জামায়াতকে আরও বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে। একই সঙ্গে, সাম্প্রতিক এসব বিতর্ক দলটির সার্বিক রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে যে ক্ষত তৈরি করেছে, তা সামলে উঠতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নীতি-নির্ধারকদের কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিএনপি কোনো দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক বৈষম্য বা তোষামোদিতে বিশ্বাস করে না। আমরা জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থন নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছি। রাজনৈতিক মাঠে ছাড় দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টি কোনো সমঝোতার বিষয় নয়; এটি জনগণের সমর্থনের বিষয়। যে দল জনগণের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হবে, তারা স্বাভাবিকভাবেই মাঠের রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়বে। কে কোন ইস্যুতে বিপদে পড়ল বা কার ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁস হলো, তা বিএনপির রাজনীতির আলোচনার বিষয় নয়। রাজনৈতিক নীতি ও জনগণের আস্থাই দিন শেষে সব হিসাব চূড়ান্ত করে।’
এই বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘রাজনীতি কোনো করুণার বস্তু নয় যে, কাউকে মাঠে জায়গা ছেড়ে দেওয়া হবে। বিএনপি লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আজকের এই অবস্থানে এসেছে। আমাদের কথা স্পষ্টÑ ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য বা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের নামে কেউ যদি ভিন্ন কোনো নীতি বা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে সাধারণ মানুষ তা বরদাশত করবে না। জামায়াত কিংবা অন্য কোনো দল যদি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মকা- ও নেতাদের কর্মকা- সামলাতে না পেরে বেকায়দায় পড়ে, সেটির দায়ভার অন্য কেউ নেবে না।’
এ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী দেশি-বিদেশি চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। তবে আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, ইসলামি আন্দোলন কখনো চক্রান্ত করে দাবিয়ে রাখা যায় না। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্যকে নিয়ে যে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে, সেটির আইনি ও প্রশাসনিক সত্যতা যাচাই করা দরকার। কোনো ব্যক্তিবিশেষের ব্যক্তিগত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গোটা আন্দোলন বা দলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এক ধরনের অপপ্রচার। আমরা দেশের মানুষের ভোটাধিকার এবং কল্যাণের জন্য কাজ করছি, প্রতিপক্ষ যদি আমাদের রাজপথে ও রাজনীতিতে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে এসব ফাঁদ ব্যবহার করতে চায়, তবে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে।’
জামায়াতে ইসলামী সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘রাজনৈতিকভাবে মাঠে আমাদের অবস্থান শক্তিশালী দেখে একটি পক্ষ নানা ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। সাতক্ষীরার সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনাটির পেছনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে তিনি ইতোমধ্যে জাতির কাছে তথ্য-প্রমাণসহ তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। এটি তার পারিবারিক জীবনের ওপর একটি অনাকাক্সিক্ষত আঘাত। আমরা বিশ্বাস করি, রাজপথে ইসলামি ও দেশপ্রেমিক শক্তির জাতীয় ঐক্য গড়ে না উঠলে দেশবাসী আবার সংকটে পড়বে। তাই বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে দেশের স্বার্থে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।’

